মর্নিংসান২৪ডটকম Date:২৯-০৬-২০১৫ Time:৮:১২ অপরাহ্ণ


112937_1

চট্টগ্রাম অফিস: অবাক করা তথ্য হলেও কিন্তু মিথ্যে নয়। মানুষ জন্ম দিয়েছে একটি পাখির বাচ্চা! ডিম ফুটে বাচ্চার জন্ম হওয়াটাই স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক রীতি পাখির। অবশ্যই মানুষের ক্ষেত্রে তার ভিন্নতা রয়েছে । কিন্তু যদি এমনই হয়, পাখির বাচ্চার জন্ম হয় মানুষের পেটে। তাও আবার একজন ৬০ বছর বয়সী পুরুষের পেট থেকে!

তাহলে ঘটনাটি নিশ্চয় বিচিত্র এবং প্রথম শুনে আশ্চর্য্য হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হ্যাঁ, প্রায় এ রকমই একটি ঘটনা ঘটেছে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার চখরিচরণ গ্রামে।

ওই গ্রামের শুকুর আলী শেখ (৬০) নামে এক কৃষকের পেটে জন্ম হয়েছে একটি ডাহুক পাখির বাচ্চা! জন্মের পর থেকে বাচ্চাটিকে বাঁশের খাচায় রেখে পোষ মানাচ্ছেন ও পরিচর্যা করছেন তিনি।

আশপাশের গ্রাম ও হাট-বাজারেও তিনি বাচ্চাটিকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরেও বেড়াচ্ছেন। তা দেখতে ভিড় করছেন উৎসুক জনতা। বাচ্চাটিকে দেখতে ও ঘটনার রহস্য জানতে প্রতিদিন শ’ শ’ কৌতুহলী মানুষ তার বাড়িতেও যাচ্ছেন দল বেঁধে।

সোমবার সকালে আষাঢ়ের বৃষ্টিতে ভিজে সরেজমিনে শুকুরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি বাড়ির উত্তর ভিটার চৌচালা টিনের ঘরের বারান্দায় ডাহুকের বাচ্চাটিকে পোকা-মাকড় ধরে এনে খাওয়াচ্ছেন।

সেখানে কথা হয় শুকুর আলী, তার স্ত্রী হাবিবা, ছেলে আলমগীর ও পুত্রবধূর সঙ্গে। তারা জানান, চার ভাই দুই বোনের মধ্যে শুকুর আলী পঞ্চম। দরিদ্র মা-বাবার সংসারে তৎকালীন আমলে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করতে পেরেছিলেন তিনি। এরপর থেকে শুকুর দিন মজুরের কাজ করছেন।

২৮ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন হাবিবা খাতুনকে। অভাবের সংসারে এসে হাবিবাও এক পর্যায়ে মাটি কাটা শ্রমিকের কাজ শুরু করেন। তাদের সংসারে জন্ম হয় তিন ছেলের। অভাব-অনাটনের সংসারে ছেলেরাও বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেননি।

বড় ছেলে মোজাম্মেল হোসেন অন্যের পিকআপ গাড়ি চালান। মেজো ছেলে আজাহার উদ্দিন পোশাক শ্রমিক ও ছোট ছেলে আলমগীর হোসেন সিএনজিচালিত অটোরিক্সা চালান।

সব ছেলেই বিয়ে করেছেন। তবে, কেউ পিতা-মাতার সংসার থেকে আলাদা হয়ে যাননি। যৌথ পরিবার তাদের। ছেলেদের আয়ে এখন সংসার খরচ ভালোভাবেই মিটে যায় তাদের।

তারপর শুকুর আলীর দীর্ঘদিনের অভ্যাস কৃষি কাজ করার। ঘরে বসে থাকতেই চান না তিনি। বাড়ির ৭ শতাংশ জমি ছাড়া চাষাবাদের তার নিজস্ব কোনো জমি নেই। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে তিনি চাষাবাদ করে থাকেন।

শুকুর আলী জানান, প্রতিবছরের মতো এ বছরও তিনি চখরিচরণ পূর্বপাড়ার চকে ২০ শতাংশ জমিতে ইরি ধান রোপন করেন। প্রায় ২৫ দিন আগে তিনি ওই জমিতে সঙ্গে আরো দুইজন কৃষি শ্রমিক নিয়ে পাকা ধান কাটতে যান।

তার ক্ষেতের পাশেই রুপচান নামের আরেক কৃষকের ধানক্ষেত। সেই ক্ষেতে ধান গাছের গোড়ায় প্রথমে রুপচান দুইটি ডিম দেখতে পান। ডিম দেখেই তিনি শুকুর আলীকে ডাক দেন।

শুকুর আলী ডিমগুলো দেখে ডাহুক পাখির মনে করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। দুদিন তিনি গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে খোঁজ করেন দেশি প্রজাতির কোনো মুরগি বাচ্চা ফুটাতে ডিমে তাপ দিচ্ছে কি না?

তা না পেয়ে শুকুর নিজেই ইচ্ছা পোষণ করেন ডাহুকের ডিম থেকে বাচ্চা ফুটাতে তিনি নিজে তাপ দিবেন। কারো কাছে না শুনে তিনি নিজেই পাকা নারিকেলের অর্ধেক মালইতে তুলা ও কিছু গরম কাপড় দিয়ে ডিম দুটি বসিয়ে দেন।

এরপর তিনি নিজের তল পেটে গামছা দিয়ে মালইটি শক্ত করে বেঁধে নেন। একটানা তিনি মালইটি পেটে বেঁধে রাখেন। এজন্য তিনি প্রতিদিন গোসল করতেও পারেনি। খাওয়া-দাওয়া ও ঘুমিয়েছেন তিনি ডিম ভরা মালই পেটে বেঁধেই।

ঘটনার ১২ দিন পর তিনি দেখতে গিয়ে দেখেন একটি ডিম ফেটে নষ্ট হয়ে গেছে। সেখান থেকে ডিমটি তিনি ফেলে দেন।

হতাশ না হয়ে শুকুর আলী আরেকটি ডিম ঠিকই মালইতে ভরে পেটে বেঁধে রাখেন। ২০ দিন পরে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়ে আসে। বাচ্চাটিকে তিনি পরিচর্যা শুরু করেন।

কয়েকদিনের মধ্যেই এ খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে প্রতিদিন পাখির বাচ্চাটিকে দেখতে আসছেন শ’ শ’ উৎসুক মানুষ।

শুকুর আলী জানান, ডাহুকের বাচ্চাটিকে তিনি পোষ মানাচ্ছেন। পোষ মানলেই খাঁচা থেকে বাচ্চাটিকে বের করবেন।

তাছাড়া, লালন-পালন করে পাখিটির বংশ বিস্তারের যাবতীয় ব্যবস্থা করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন শুকুর আলী।

বাচ্চাটিকে দেখতে আসা রফিকুল ইসলাম জানান, মানুষের পেটে পাখির বাচ্চা হয়েছে শুনে তিনি দেখতে এসেছেন। পাখি প্রেমিক বলেই শুকুর আলী ধৈর্য্য সহকারে পেটের তাপ দিয়ে ডিম ফুটাতে পেরেছেন।

স্থানীয় চক মিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন জানান, মানুষ পারে না এমন কোনো কাজ নেই, শুকুর তা আবারো প্রমাণ করলেন।

এ রকম ধৈর্য্য ও চিন্তাশীল ব্যক্তি এই ইউনিয়নের বাসিন্দা। এজন্য তিনি গর্বিত বলেও জানান।