সাকা’র রায়, নাশকতার আশংকায় সাক্ষীর বাড়িতে পুলিশের টহল

ctgBG_606303559

চট্টগ্রাম অফিস:
মানবতা বিরোধী অপরাধেে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আপিলের রায় ঘোষণা নিয়ে নাশকতার আশংকায় চট্টগ্রামে সাক্ষীদের বাড়িঘরে পুলিশ টহল দিচ্ছে।নিরাপত্তায় পুলিশকে সহযোগিতার জন্য বিজিবি মোতায়েনেরও প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

রাউজান উপজেলার গহিরা, জগৎমল্ল পাড়া, উনষত্তরপাড়া, কুন্ডেশ্বরী, সুলতানপুরসেহ আশপাশের গ্রামগুলোতে বসবাস করেন একাত্তরে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাহিনীর হাতে নির্যাতিত কয়েক’শ পরিবার। এসব পরিবারের বেশ কয়েকজন ট্রাইব্যুনালে গিয়ে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।
২০১৩ সালে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায় ঘোষণার কমপক্ষে এক সপ্তাহ আগে থেকে অধিকাংশ সাক্ষী হামলার আশংকায় বাসায় তালা দিয়ে অজ্ঞাতস্থানে চলে গিয়েছিলেন।

চট্টগ্রামের হাটহাজারী সার্কেলের সহকারি পুলিশ সুপার মো.মশিউদৌলা রেজা বলেন, রাউজানে ২০ থেকে ২৫ জন সাক্ষী থাকেন।সাক্ষীদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে আলাদা আলাদা তালিক‍া করা হয়েছে। তাদেরসহ নির্যাতিত পরিবারের বাড়িগুলোতে পুলিশ প্রহরা বসানো হয়েছে।

এদিকে রাউজান থানা থেকে উপ-পরিদর্শকের নেতৃত্বে আটটি টিম করে বিভিন্ন পাড়ায় পাঠানো হয়েছে। সেখানে তাদের সার্বক্ষণিক টহল দেয়ার জন্য বলা হয়েছে।

রাউজানের গহিরায় জন্ম নেয়া সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী সেখান থেকে বেশ কয়েকবার সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

পরবর্তীতে পাশের উপজেলা রাঙ্গুনিয়া থেকেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বারবার দলবদল করে শেষ পর্যন্ত বিএনপিতে আসা এ রাজনীতিক।

রাউজান ছাড়াও রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী, হাটহাজারী এবং ফটিকছড়িতেও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন এমন বেশ কয়েকজন বসবাস করেন। এসব এলাকায়ও বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) মুহাম্মদ নাঈমুল হাছান।

নাঈমুল বলেন, আমরা সাক্ষীদের অবস্থানের বিষয়ে খোঁজেখবর নিয়েছি। সাক্ষীদের অনেকে বাড়িতে থাকেন না, শহরের বাসায় থাকেন।যারা থাকেন এবং ‍যারা থাকেন না সবার বাড়িঘরকে ঘিরে টহল জোরদার ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় গত দুইদিন ধরেই এ টহলে রয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন হবে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকাল থেকে। তখন সাক্ষীদের বাড়িতে সার্বক্ষণিকভাবে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে।

জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে নাশকতা মোকাবেলায় এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তায় সতর্ক থাকার জন্য সব ওসিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে ।
মঙ্গলবার সকালে রাঙামাটি, বান্দরবান পুলিশ লাইন, জেলার রিজার্ভ ফোর্স, এপিবিএন ও শিল্প পুলিশ মিলিয়ে প্রায় এক হাজার অতিরিক্ত ফোর্স আসবে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের প্রায় আড়াই হাজার ফোর্সসহ মোট সাড়ে তিন হাজার পুলিশ জেলায় মোতায়েন থাকবে।

এছাড়া রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও ভুজপুরে দুই প্লাটুন করে বিজিবি এবং অন্যান্য উপজেলায় প্রয়োজন সাপেক্ষে বিজিবি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ। এজন্য জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। বিজিবি সদস্যরা ২৯ জুলাই বুধবার সকাল থেকে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট এলাকায় মোতায়েন থাকবে বলে সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে নগরীতে নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও সাক্ষীদের বাসায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য।

২০১৩ সালের ১ অক্টোবর বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য সাকা চৌধুরীকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

একই বছরের ২৯ অক্টোবর খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেন তিনি। তবে সর্বোচ্চ সাজা হওয়ায় আপিল করেননি রাষ্ট্রপক্ষ।

ট্রাইব্যুনালে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট ২৩টি অভিযোগের মধ্যে ১৭টির পক্ষে সাক্ষী হাজির করেন রাষ্ট্রপক্ষ। এগুলোর মধ্যে মোট ৯টি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালের রায়ে। বাকি আটটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষ যে ছয়টি অভিযোগের পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করেননি সেগুলো থেকেও সাকা চৌধুরীকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

প্রমাণিত অভিযোগগুলোর মধ্যে চারটিতে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে সাকা চৌধুরীকে। তিনটি অভিযোগের প্রত্যেকটিতে ২০ বছর এবং আরো দু’টি অভিযোগের প্রতিটিতে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে তাকে। সব মিলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি মোট ৭০ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন তিনি।

যে চারটি হত্যা-গণহত্যার দায়ে সাকাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো ৩ নম্বর (অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা), ৫ নম্বর (রাউজানের সুলতানপুর গ্রামে তিনজনকে গণহত্যা), ৬ নম্বর (রাউজানের ঊনসত্তরপাড়ায় ৫০-৫৫ জনকে গণহত্যা) এবং ৮ নম্বর (চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোজাফফর আহম্মদ ও তার ছেলে শেখ আলমগীরকে হত্যা) অভিযোগে।

অন্যদিকে ২ নম্বর (রাউজানের গহিরা গ্রামের হিন্দুপাড়ায় গণহত্যা), ৪ নম্বর (জগৎমল্লপাড়ায় ৩২ জনকে গণহত্যা) এবং ৭ নম্বর অভিযোগে (রাউজানের সতীশ চন্দ্র পালিতকে হত্যা) আনা তিন হত্যা-গণহত্যায় সাকা চৌধুরীকে ২০ বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

১৭ এবং ১৮ নম্বর অভিযোগে সাকা চৌধুরীকে আরও পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যে দু’টি অভিযোগে যথাক্রমে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ, সিরাজ ও ওয়াহেদ ওরফে ঝুনু পাগলাকে অপহরণ করে নির্যাতন এবং চান্দগাঁওয়ের সালেহউদ্দিনকে অপহরণ করে সাকা চৌধুরীর পারিবারিক বাসভবন গুডসহিলে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে।