কোকেন:তদন্ত দেশে সীমাবদ্ধ, মূল হোতারা ধরা ছোয়ার বাইরে

কোকেন:তদন্ত দেশে সীমাবদ্ধ, মূল হোতারা ধরা ছোয়ার বাইরে
কোকেন:তদন্ত দেশে সীমাবদ্ধ, মূল হোতারা ধরা ছোয়ার বাইরে

চট্টগ্রাম নিউজ প্রতিবেদন:
রহস্য উদঘাটনের খুব কাছে গিয়েও এর ভেতরে প্রবেশ করতে না পারলে কোকেন পাচারের রহস্য অনুদঘাটিতই থেকে যাওয়ার আশংকা করা হচ্ছে।
কারণ তরল কোকেন পাচারের ঘটনায় দেশের মধ্যে সম্পৃক্ত ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও এর মূল হোতাদের ধারে কাছেও যেতে পারেনি তদন্ত সংস্থা চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

গ্রেপ্তার ছয় জনের মধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া তিন আসামির জবাববন্দিতে মূল হোতা হিসেবে ভারত, বলিভিয়া ও যুক্তরাজ্যের সাতজনের সম্পৃক্তার তথ্য পেয়েও তাদের ব্যাপারে অন্ধকারে রয়েছে ডিবি।

মূলত দেশি-বিদেশী এই চক্রের সন্ধান পেলেও আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে ঘটনার মূলে যেতে পারছেনা সিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা। মূল হোতাদের নাম জানলেও জানতে পারছেনা ঠিকানা। আর যেসব নাম জেনেছে সেটি কতটুকু সত্য সে বিষয়েও নিশ্চিত হতে পারছেনা ডিবি। ফলে কার্যত কোনো কূল কিনারাই মিলছেনা আলোচিত এই মামলাটির।
গ্রেপ্তার ছয় আসামির কাছ থেকে রিমান্ডে প্রাপ্ত তথ্য ও তিন জনের ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে তিন দেশের যে সাত জনের নাম উঠে এসেছে তাদের তথ্য ও অবস্থান নিশ্চিত হতে আন্তর্জাতিক পুলিশ তদন্ত সংস্থা-ইন্টারপোলের সহায়তা চেয়ে গত ৩০ আগস্ট একটি চিঠি দেয় তদন্ত সংস্থা ডিবি। পুলিশ সদপ্তরের মাধ্যমে দেয়া সেই চিঠির কোনো জবাব এখনো পায়নি ডিবি। এছাড়া গত আগস্টে কোকেন কাণ্ডের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক বকুল মিয়ার গ্রামের বাড়ী সিলেটে গিয়েও তথ্য বিহীন খালি হাতে ফেরত এসেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কামরুজ্জামান। প্রথমদিকে আটক করেও ছেড়ে দেয়া ‘আমদানিকারক’ প্রতিষ্ঠান খান জাহান আলী লিমিটেডের চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদও ইতোমধ্যে দুবাইতে পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। তবে ডিবির দাবি, তিনি ‘পলাতক’ তাকে খুঁজে পাচ্ছেনা ডিবি।

বিষয়টি স্বীকার করে মামলার তদারক কর্মকর্তা ও নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, ‘কোকেন পাচারের মূল রহস্য এখনো উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। দেশের মধ্যে থাকা যে ৬ জনের সম্পৃক্তা পেয়েছি তাদের প্রত্যেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু মূল হোতা হিসেবে বিদেশে অবস্থানকারী যাদের নাম এসেছে তাদের ব্যাপারে বিস্তারিত ও বস্তুনিষ্ট কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘লন্ডনে অবস্থানরত বকুলমিয়া, ভারতের রাজুসহ যাদের নাম তদন্তে ও আসামিদের জবানবন্দিতে এসেছে তাদের তথ্য ও অবস্থান জানতে গত ৩০ আগস্ট আমরা ইন্টারপোলের কাছে একটি চিঠি দিলেও সেখান থেকে কোনো রেসপনস পায়নি। আপাতত বিদেশে অবস্থানকারীদের ব্যাপারে সঠিক কোনো তথ্য না পেলেও দেশে থেকে তেমন কিছু করার থাকছেনা। আমরা বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তরকে জানিয়েছি।’

উল্লেখ্য, নগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে তরল কোকেন সন্দেহে গত ৬ জুন রাতে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি কনটেইনার বন্দরে সিলগালা করে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। ৮ জুন এটি খুলে প্রাথমিক পরীক্ষায় ১০৭টি ড্রামের কোনটিতেই কোন কোকেন না পেলেও পরবর্তীতে ২৭ জুন ঢাকার দুই ল্যাবে ৯৬ নম্বর ড্রামে কোকেনের অস্তিত্ব পায় শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর।

পরবর্তীতে গত ৮ জুলাই আদালতের নির্দেশে বন্দরে গিয়ে আবারও মামলার আলামত সংগ্রহ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। সেখান থেকে তিনটি করে নমুনা সংগ্রহ করে ৩২১টি কোটায় করে আদালতের নির্দেশে সেই আলামত পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় আর্মড ফোর্সেস ফুড এন্ড ল্যাবরেটরিজ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং সিআইডিতে। সেখান থেকেও ৯৬ নম্বর ড্রামে তরল কোকেনের অস্তিত্ব পাওয়ার কথা জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

ফের আদালতের নির্দেশে পুনঃপরীক্ষা করে গত ৭ সেপ্টেম্বর ৫৯ নম্বর ড্রামেও কোকেনের অস্তিত্ব পাওয়ার কথা জানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এ সংক্রান্ত একটি চিঠি ৯ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এসে পৌঁছেছে। এরমধ্য দিয়ে ১০৭ ড্রাম তেলের মধ্যে ২টিতে তরল কোকেনের অস্তিত্ব মিলেছে।

কোকনে পাচারের ঘটনায় গত ২৮ জুন আদালতের নির্দেশে নগরীর বন্দর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ওসমান গনি বাদি হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯ এর ১(খ) ধারায় জাহান আলী লিমিটেডের চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ ও সোহেলকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। পরে ওই মামলায় সোহেল ও আরো তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই মামলায় এ পর্যন্ত মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার ছয় আসামিকে কয়েক দফা রিমান্ডে নেয়ার পর সবাইকে একসাথে রিমান্ডে এনে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও ঘুরে ফিরে একই তথ্যই জানিয়েছেন তারা। তাদের কাছ থেকে নতুন কোনো তথ্য আদায় করতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। এরই মধ্যে নিজেদের সম্পক্তার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন মামলার অন্যতম তিন আসামি। জবানবন্দি দেয়া তিন আসামি হলেন- খানজাহান আলী লিমিটেডের মালিকানাধীন প্রাইম হ্যাচারির ব্যবস্থাপক গোলাম মোস্তফা সোহেল, সিকিউরিটিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মেহেদি আলম ও আবাসন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা গোলাম মোস্তাফা সোহেল।

জবানবন্দিতে তারা তিনজনই স্বীকার করেছেন, লন্ডনে অবস্থানরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বৃটিশ নাগরিক বকুল মিয়া মোস্তাফা কামালের মামাত ভাই। বকুল মিয়া ২০১৫ সালের শুরুতে সানফ্লাওয়ার তেলের সঙ্গে কোকেন পাঠালে সেটি বন্দর থেকে খালাসে কয়েকজনকে সহযোগিতা করার অনুরোধ করেন মোস্তাফা কামালকে। আর বকুলের এই প্রস্তাবে রাজি হন মোস্তাফা কামাল। তাদের মধ্যে প্রথামিকভাবে এসব কথাবার্তা মোবাইলে হলেও পরবর্তীতে বকুল মিয়া ই-মেইলে আরও বিভিন্ন তথ্য বিনিময় করেন। ই-মেইলের মাধ্যমে বকুল মিয়া মোস্তফা কামালকে গোলাম মোস্তফা সোহেলের বিষয়ে তথ্য দেন।

এরপর গোলাম মোস্তফা সোহেলের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর তার সাথে কাজ করতে গিয়ে ভারতে অবস্থানরত রাজু’র সঙ্গে মোস্তাফা কামালের মোবাইলে যোগাযোগ হয়। এরপর একে একে এই কাজে সম্পৃক্ত হন কসকো শিপিং লাইনসের ম্যানেজার একে আজাদ, সিকিউরিটিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মেহেদী আলম, গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মণ্ডল গ্রুপের বাণিজ্যিক নির্বাহী আতিকুর রহমান ও সিএন্ডএফ এজেন্টের কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম।

গোলাম মোস্তফা সোহেল, এ কে আজাদ, আতিকুর রহমান, মেহেদি আলম, সিএন্ডএফ কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম মোস্তফা কামাল মিলে কোকেনের চালানটি খালাসের চেষ্টা করেছিলেন। তাদের শুধু চালানটি খালাস করার কথা ছিল। সেটি কোথায় যাবে কিংবা এর পরের বিষয়ে কোন নির্দেশনা তাদের দেয়া হয়নি বলে জবানবন্দিতে জানানো হয়।

গ্রেফতার হওয়া আসামিরা জানিয়েছিলেন ভারতের রাজু, ব্রিটেনের বকুল মিয়াসহ সাতজন ব্যক্তি যোগাযোগ করে বলিভিয়া থেকে একটি ট্রাকযোগে কোকেনের চালান নিয়ে যায় উরুগুয়েতে। উরুগুয়ের মন্টিভিউ বন্দর থেকে এসব কোকেন তোলা হয় এমভি কসকো-চায়না ৬৪ ই জাহাজে। পরে গত ২১ মে সিঙ্গাপুরে এসে জাহাজ বদল হয়। সেখান থেকে এ চালান বাংলাদেশে নিয়ে আসে কসকো শিপিংয়ের অপর জাহাজ এম ভি থ্রস ট্রিম ভি-৬৭। চট্টগ্রাম বন্দরে এ কনটেইনার আসার পর গ্রেপ্তারকৃতরা বাংলাদেশে তা খালাসের চেষ্টা করেন।

মামলার তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, কোকেন চোরাচালানের এ মামলায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হলে প্রয়োজন রাঘববোয়ালদের খুঁজে বের করা। এ জন্য বিদেশ যেতে পুলিশ সদর দপ্তরেও আবেদন করা হয়েছিল। এখন পর্যন্ত বিদেশে গিয়ে তদন্ত করার কোনো অনুমতি মেলেনি তদন্ত সংস্থা ডিবির।

এদিকে বাংলাদেশী ল্যাবে দুটি ড্রামে তরল কোকেনের অস্তিতের প্রমাণ মিললেও তবে কী পরিমাণ কোকেন রয়েছে সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কেকনা তরল থেকে কোকেন আলাদা করার অত্যাধুনিক সরঞ্জাম নেই বাংলাদেশে। চালানটি আটকের পর জাতিসংঘ থেকে বিশেষজ্ঞ এনে তরল থেকে কোকেন আলাদা করার কথা বলেছিলেন সিএমপি কমিশনার আবদুল জলিল মণ্ডল। সপ্তাতখানের মধ্যে আসতে থাকা বিশেষজ্ঞ দলটি চালান আটকের আড়াই মাস পরও আসেনি।

সিএমপির মূখপাত্র নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (বন্দর-পশ্চিম) এস এম তানভীর আরাফাত বলেন, ‘দেশের মধ্যে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে তাদের আমরা গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। এখন এই কোকেন কাণ্ডের মূল হোতারা দেশের বাইরে থাকায় তাদের ব্যাপারে তদন্ত করতে হলে বিদেশে যেতে হবে। ইতোমধ্যে ইন্টারপোলের যে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে সেটি পেলে বিষয়টি কিছুটা পরিস্কার হওয়া যাবে।’