দেবী দূর্গা কী…………..

দেবী দূর্গা কী..............
দেবী দূর্গা কী…………..

সুমন দত্ত: দেবী দূর্গা সম্পর্কে অনেক হিন্দু ধর্মালম্বীগণ ভালো করে জানে না। জানে শুধু আশ্বিন মাসে দূর্গা পূজা হয়। নতুন জামা-কাপড় ও প্যান্ডেলে ঘোড়াঘুড়ি। বাংলাদেশের টিভি ও মিডিয়ার সাংবাদিকগণ দূর্গাপূজা সম্পর্কে বলতে গিয়ে অনেক বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন করেন। সকলের সুবিধার্থে দেবী দূর্গা সম্পর্কে একটি স্বল্প পরিসরে আলোচনা করার চেষ্টা করলাম।

দূর্গা মূলত শক্তি দেবী। বৈদিক সাহিত্যে দূর্গার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে দূর্গার বিশেষ আলোচনা ও পূজাবিধি তন্ত্র ও পুরাণেই প্রচলিত। যে সকল পুরাণ ও উপ-পুরাণে দূর্গা সংক্রান্ত আলোচনা রয়েছে সেগুলি হলো- মৎস্য পুরাণ, মার্কন্ডেয় পুরাণ, দেবীপুরাণ, কালীকাপুরাণ ও দেবী ভাগবত। তিনি জয়দূর্গা, জগদ্ধাত্রী, গন্ধেশ্বরী, বনদূর্গা, চন্ডী, নারায়নী প্রভৃতি নামে ও রূপে পূজিত হন। বছরে দুই বার দূর্গা উৎসবের প্রথা রয়েছে- আশ্বিন মাসের শুকপে শারদীয়া এবং চৈত্র মাসের শুকপে বাসন্তী দূর্গাপূজা।

দূর্গা অর্থাৎ “যিনি দূর্গ বা সংকট থেকে রক্ষা করেন”; অন্যমতে, “যে দেবী দূর্গম নামক অসুরকে বধ করেছিলেন”। দেবী দূর্গার অনেকগুলো হাত। তাঁর অষ্টাদশভূজা, ষোড়শভূজা, অষ্টভূজা ও চতুর্ভূজা মূর্তি দেখা যায়। তবে দশভূজা রূপটি বেশী জনপ্রিয়। তাঁর বাহন সিংহ। মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তিতে তাঁকে দেখা যায়।

হিন্দু শাস্ত্রে “দূর্গা শব্দটিকে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে-

দৈত্যনার্শাথবচনো দকারঃ পরিকীর্তিতঃ।
উকারো বিঘ্ননাশস্য বাচকো বেদসম্মত।
রেফো রোগঘ্নবচনো গশ্চ পাপঘ্নবাচকঃ।
ভয়শত্রুঘ্নবচনশ্চকারঃ পরিকীর্তিত।

অর্থাৎ “দ” অরটি দৈত্য বিনাশ করে, উ-কার বিঘ্ন নাশ করে, রেফ রোগ নাশ করে, “গ” অরটি পাপ নাশ করে এবং আ-কার শত্র“ নাশ করে। এর অর্থ দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দূর্গা”। অন্যদিকে শব্দকল্পদ্রুম বলেছে, “দূর্গং নাশয়তি যা নিত্যং সা দুর্গা বা প্রকীর্তিতা”। অর্থাৎ যিনি দূর্গ নামে অসুরকে বধ করেছিলেন, তিনি সব সময় দূর্গা নামে পরিচিত। শ্রীশ্রী চণ্ডী অনুসারে যে দেবী “নিঃশেষদেবগণশক্তিসমূহমূর্ত্যাঃ” (সকল দেবতার সম্মিলিত শক্তির প্রতিমূর্তি), তিনিই দূর্গা।

ষষ্ঠী, শীতলা, মনসা। মহাসরস্বতী রজোগুণময়ী মহালী এবং সত্বগুণময়ী, তমোগুণময়ী মহা কালী। করা হয়েছে তে দেবী তিনটি রূপ কল্পনা শ্রীশ্রী চণ্ডী। প্তপরিবর্ধিত ও পূর্ণতাপ্রা, শক্তিবাদ এই দেবী দূর্গাদেবী কেন্দ্র করে অঙ্কুরিত। মহাশক্তিরই অংশভূতা অন্নপূর্ণাদিও এই সুবচণী, গন্ধেশ্বরী। বর্ণ অতসী ফুলের মত হরিদ্রাভ, তাঁর বদন পূর্ণ চন্দ্রের ন্যায় সুন্দর। অর্ধেন্দুকৃত শেখরা এবং ত্রিনয়না, কেশরাজি সমাযুক্তা: দেবী দূর্গা: ধ্যানাশ্রিত মূর্তি গ্রীবা এই স্থানত্রয় একটু বঙ্কিমভাবে র বামজানু কটি ওতাঁ। পযোধরা-পীনোন্নত, দশনা-সুচারু, ভূষিতা-সরাভরণ, সম্পন্না নবযৌবন, ত্রিলোকে সুপ্রতিষ্ঠাতা তিনি। মৃণালের ন্যায় দশবাহু সমন্বিত তিনি মহিষাসুর মর্দিনী এবং স্থাপিত।

বীর পদতলেদে। পরশু শোভিত, ঘন্টা, অঙ্কুশ, পাশ, ঐ রূপক্রমে খেটক ধেনু তীক্ষ্মবাণ ও শক্তি এবং বাম করে, চক্র, খড়গ, ক্রমে ত্রিশূলঃ অধ-ঊর্ধ্ব তাঁর দক্ষিণ পঞ্চকরে চু রোষ, রুধিরাক্ত তাতে দৈত্যর দেহ। নিপ্তি শূল ঐ দৈত্যের হৃদয় বিদীর্ণ করেছে দেবীর। উক্ত মহিষ থেকে উদ্ভূত এক খড়গপাণি দানব। স্কন্ধ মহিষ-ছিন্ন দক্ষিণপদ দেবীর। দৈত্যের রুধির বমন ও দ্রুকুটিতে ভীষণ দর্শন হয়েছে তাতে। আছেন তাতে দৈত্যের কেশ আকর্ষণ করে, দেবী নাগপাপযুক্ত। কষায়িত দেবী। অতিচণ্ডিকা পরিবেষ্টিতা চণ্ডরূপা ও, চণ্ডাবতী, চণ্ডা, চণ্ড নায়িকা, চণ্ডোগ্রা, প্রচণ্ডা, উগ্রচণ্ডা দেবী অষ্টশক্তি যথা। সিংহোপরি এবং বামপদ দৈত্যের কাঁধে অবস্থিত। ফলদাত্রী এবং জগদ্ধাত্রী কাম ও মো এই চর্তুবর্গ, অর্থ, ধর্ম।

দেবী পূজার দুটি ধারা

একদিকে তিনি অতি সৌম্যা মাতৃরূপা হ্লে বাৎসল্যে জগত পালন করেন। আশ্রিত, ভক্ত, সাধক, সন্তানকে দান করেন ভয় ও অভয়। ভীষণা মূর্তি হয়ে তাঁর সংহার নীলা-আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে কালান্তক অভিযান। দেবী পূজার ফলও দ্বিবিধ-ভক্তি ও মুক্তি। রাজা সুরখ, রামচন্দ্র, অর্জুন, শিবাজী রানা প্রতাপ, গোবিন্দ সিং প্রমুখ অভু্যদয়কামী রাজণ্যবর্গ ও স্বদেশপ্রেমী সাধকগণ দেবীর ভীষণা মূর্তির সাধনা করেন- বীর‌্য, ঐশ্বর‌্য, রাজ্য, শত্রুবধ, বিজয়, স্বাধীনতা লাভ করেছেন। অপরদিকে সমাধি বৈশ্য, রামপ্রসাদ, কমলা কান্ত, বামাক্ষ্যাপা, রামকৃষ্ণ প্রমূখ ভাব সাধকগণ দেবীর করুণাময়ী, দয়াময়ী, সৌম্যমূর্তির সাধনা, উপাসনা করে লাভ করেছেন প্রেম ভক্তি, জ্ঞান, বৈরাগ্য-মহামুক্তি। রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য পূজা করেছিলেন উত্তরায়ণে বসন্তকালে। উত্তরায়নই দেবদেবীর পূজার প্রকৃষ্ট সময়। দু’জনই দেবী পূজায় স্ব স্ব অভীষ্ট ফল লাভ করেছিলেন। রাজা সুরথ রাজ্য ফিরে পেয়েছিলেন আর সমাধি বৈশ্য পেয়েছিলেন মহামুক্তি।

দেবীর কল্পারম্ভ অর্থ সঙ্কল্পঃ সঙ্কল্প অর্থ দেবী বা দেব পূজার উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যই মানুষকে দেব বা দেবীপূজায় নিয়োজিত করে। সংকল্প যেখানে স্থির, গভীর একাগ্র, শ্রদ্ধাযুক্ত পূজা সেখানেই সার্থকতা মণ্ডিত। সকল দেবদেবী পূজাতেই সংকল্প আছে। কিন্তু দূর্গা পূজার সঙ্কল্প একটু বৈশিষ্টপূর্ণ। দূর্গা পূজার সঙ্কল্প সাত প্রকার। কৃষ্ণানবমী, প্রতিপদ, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী বা নবমীতেও সংকল্প করে পূজা করতে পারেন। কল্পারম্ভ বা সংকল্প করা মানে চণ্ডীর ঘট স্থাপন করে যথাশক্তি পূজা।

বোধন অর্থ দেবীকে জাগ্রত করে আহ্বান করা। পৃথিবীর এক বছর (ছয় মাস দিন ও ছয় মাস রাত্রি) দেবগণের একদিন। অর্থাৎ পৃথিবীর এক বছর দেবগণের একদিন। শ্রাবণ থেকে পৌষ দেবগণের রাত্রি এবং মাঘ থেকে আষাঢ় দেবগণের দিন। শ্রী হরির শয়ণ থেকে উত্থান পর‌্যন্ত রাত্রি। তাই শ্রাবণ থেকে পৌষ দেবদেবীর পূজায় বোধন অপরিহার্য্য। শারদীয় দূর্গোৎসব দেবদেবীগণের রাত্রি বিধায় বোধন করতে হয়। এ সময়টাকে দক্ষিণায়ন বা পিতৃপও বলে। তাই দেবীর আবাহনের পূর্বে পিতৃপ অনুযায়ী তর্পণাদির ব্যবস্থা আছে। অনুষ্ঠানের নাম “মহালয়া পার্বণ শ্রাদ্ধম”।

দেবীপূজা জাতি গঠনের প্রেরণা। সংহতিই জাতি গঠন বা রাষ্ট্র গঠনের মূল ভিত্তি। এই সংহতিকে জাতির কল্যাণে সার্থক প্রয়োগেই রাষ্ট্র নির্মাণ পূর্ণাঙ্গ হয়। বৈদিক সূত্রে দেবী নিজেই বলেছেন ‘অহং রাষ্ট্রী’। আমি এই বিশ্ব রাজ্যের অধীশ্বরী। দেবী প্রতিমায় আমরা যে পূজা করি তার দিকে দৃষ্টি দিলে এই রাষ্ট্র পরিকল্পনার নিখুঁত দিকটি কি প্রকাশিত হয় না? প্রত্যেক রাষ্ট্রে চারটি শ্রেণীর মানুষ দেখা যায়। বুদ্ধিজীবী, বীর‌্যজীবী, বৃত্তিজীবী ও শ্রমজীবী। এ চার শক্তির পূর্ণ অভিব্যক্তি ও পরষ্পরের সাহচর্য যেখানে অবিঘ্নিত সে জাতি বা রাষ্ট্র অপ্রতিহত গতিতে তার ল্যপথে এগিয়ে যেতে সম। পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র ভাবনা থেকেই এ দেশে সৃষ্টি হয়েছিল ব্রাহ্মণ, ত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র চার বর্ণ। এ বিভাগ ভেদ-বুদ্ধি প্রণোদিত নয়।
দেবীর দক্ষিণে লক্ষ্মী ও গণেশ বামে সরস্বতী ও কার্তিক। লক্ষ্মী ধনশক্তি বা বৈশ্য শক্তি। গণেশ জনশক্তি, শূদ্রশক্তি বা শ্রমশক্তি। সরস্বতী জ্ঞানশক্তি বা ব্রহ্মণ্যশক্তি এবং দেব সেনাপতি কার্তিকেয় ক্ষাত্রশক্তির দেবতা।

দেবী দূর্গা যখন আমাদের মধ্যে অবতীর্ণ হোন তখন তিনি একা আসেন না। পুত্রকন্যা স্বরূপ চার শক্তিকে নিয়েই আসেন। দেবীর প্রতিমা দর্শনে লব্ধ জ্ঞানই রাষ্ট্রী জ্ঞান বা রাষ্ট্রী বিজ্ঞান। বস্তুত দূর্গা প্রতিমাই জাতীয় প্রতিমা। দেবী পূজায় সমাজের সকল স্তরের লোকই প্রয়োজন। হাত কর্মের প্রতীক। আলস, নিদ্রা, তন্দ্রা, জড়তা, নিবীর‌্যতার মহাপাপ দূরীভূত করে জাতির মধ্যে সর্বতঃপ্রসারি কর্মশক্তি জাগিয়ে তোলার জন্যই তিনি দশভূজা। দশে মিলে কাজ করার, কল্যাণ করার, সুন্দর সমাজ গড়ার কাজ নিয়েছেন বলেই তিনি দশভূজা। জাতির সকল প্রকার অশুভ বিনাশ করার জন্যই তিনি দশ প্রহরণধারিণী।

পশুরাজ সিংহ কেন দেবীর বাহন?
কালিকা পুরাণ মতে শ্রী হরি দেবীকে বহন করছেন। হরি শব্দের এক অর্থ সিংহ। শ্রী শ্রী চণ্ডীতে উল্লেখ আছে গিরিরাজ হিমালয় দেবীকে সিংহ দান করেন। শিবপুরাণ বলেন ব্রহ্মা দূর্গাকে বাহনরূপে সিংহ দান করেছেন শুম্ভ ও নিশূম্ভ বধের সুবিধার্থে। দেবীর বাহ্য লণের সাথে সিংহের লক্ষণগুলো মিলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে দেবীর বাহন রূপে সিংহ কেন? দেবী নিখিল বিশ্বে রাষ্ট্রী বা সম্রাজ্ঞী। সিংহ পশু রাজ্যের সম্রাট। দেবী অস্ত্রধারিণী, সিংহও দন্ত-নখরধারী। দেবী জটাজুট সমাযুক্ত, সিংহ কেশরী। দেবী মহিষাসুর মর্দিনী, সিংহ মহিষের সাথে যুদ্ধ বিজয়ী। সিংহের খাবায় এমন শক্তি যে এক থাবায় মহিষের খুলি মস্তক থেকে ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। সিংহ একটি মহাবীর্যবান পশু। আধ্যাত্মিকতার দিক থেকেও বিচার করা যেতে পারে। অসীম শক্তিশালী সিংহের কাছে আমাদের শিা নিতে হবে আত্মসমর্পণের। দেবীর পদতলে নিত্য শরণাগত। জীব মাত্রই পশু। পশু চায় পশুত্ব থেকে মুক্তি, চায় দেবত্বে উন্নীত হতে। তাই মাতৃচরণে ঐকান্তিক শরণাগতি। সিংহ পশু শ্রেষ্ঠ হয়েও দেবশক্তির আধার হয়েছেন শুধু দেবির শরণাগতির প্রভাবেই। অপরদিকে দেবীর লক্ষ্য লোক কল্যাণ। সত্বগুণময়ী মা রজোগুণোময়ী সিংহকে বাহন নিয়ন্ত্রণ করে লোকস্থিতি রা করেছেন। রজোগুণের সঙ্গে তমোগুণের সমন্বয় ঘটলে লোককল্যাণ না হয়ে হবে লোকসংহার। তাতে আসুরিকতা ও পাশবিকতার জয় হবে। এই পাশবিকতা ও আসুরিকতার সংহার করে, উচ্ছেদ করে লোকস্থিতি ও সমাজ কল্যাণকর কাজ সমাধা করতে চাই রজোগুণাত্বক শক্তির সাধনা। তাই দেবি সত্বগুণময়ী হয়ে রজোগুণাত্মক সিংহকে করেছেন বাহন, অর্থাৎ অনুগত আজ্ঞাবহ ভৃত্য।

দেবী দূর্গার প্রণাম মন্ত্র:
সর্ব মঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে।
শরণ্যে ত্রাম্বকে গৌরী নায়ায়ণী নমোহস্তুতে।।