মর্নিংসান২৪ডটকম Date:০৭-১১-২০১৫ Time:৭:১৬ অপরাহ্ণ


আজ কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ৮৯তম জন্মদিন

আজ কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ৮৯তম জন্মদিন

চট্টগ্রাম অফিস: অমর একুশের প্রথম কবিতার স্রষ্টা, ভাষা সংগ্রামী বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, ‘সীমান্ত’ সাময়িকীর সম্পাদক ও পঞ্চাশের দিকের চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রদূত কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ৮৯তম জন্মদিন আজ ৭ নভেম্বর।

কবির ৮৯তম জন্মদিন উপলক্ষে উচ্চারক আবৃত্তি কুঞ্জ দিনব্যাপী আলোচনা ও আবৃত্তি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

১৯২৭ সালের ৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামে আসাদ চৌধুরী পরিবারে তাঁর জন্ম। তিনি ২০০৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

মাহবুব উল আলম চৌধুরী নানা বিষয়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে বহু কবিতা, গল্প, নাটক এবং প্রবন্ধ রচনা করেছেন। ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। তাছাড়া সম্পাদনা করেছেন পূর্ব পাকিস্তানে প্রকাশিত প্রথম মর্যাদাবান মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘সীমান্ত’ (১৯৪৭-১৯৫২)। সত্তর দশকে সম্পাদনা করেন চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক স্বাধীনতা’ (১৯৭২-১৯৮২)। দীর্ঘ সময়ব্যাপী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং রাজনীতিতে একই মেলবন্ধনে মিলিয়েছিলেন তিনি।

মাহবুব উল আলম চৌধুরী ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন ছাত্র কংগ্রেসের কর্মী হিসেবে। ১৯৪৩ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং দুর্ভিক্ষ-পীড়িতদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৪৬-১৯৫০ সাল দেশে যে সমস্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা অনুষ্ঠিত হয়, তিনি তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে বিরাট আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৫০ সালে তিনি চট্টগ্রামে দাঙ্গা-বিরোধী সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন এবং দুইশ’ পৃষ্ঠা সম্বলিত দাঙ্গাবিরোধী ‘সীমান্ত’ প্রকাশ করেন। ১৯৫১ সালে চট্টগ্রামের হরিখোলার মাঠে ১৬ থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সাংস্কৃতিক সম্মেলনের তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান সংগঠক।

১৯৫২ সালে চট্টগ্রাম সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। একই বছর কুমিল্লায় যে সাংস্কৃতিক সম্মেলন হয়, সেই সম্মেলনে চট্টগ্রামের প্রায় একশ জন শিল্পী সাহিত্যিক তার নেতৃত্বে যোগদান করেন। সম্মেলনে অনুষ্ঠিত নজরুল সঙ্গীতের আসর তিনি উদ্বোধন করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রণ্ট কর্মী শিবিরের আহ্বায়ক ছিলেন। একই বছর ঢাকায় কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনে চট্টগ্রাম থেকে শতাধিক শিল্পী-সাহিত্যিকদের যে প্রতিনিধি দল যোগদান করে মাহবুব উল আলম চৌধুরী তার দলনেতা ছিলেন তিনি চট্টগ্রামে ‘প্রান্তিক নবনাট্য সংঘ’ এবং ‘কৃষ্টিকেন্দ্র’র প্রাণ প্রতিষ্ঠাতা।

‘আবেগধারা’ তাঁর ছোটবেলায় লিখিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এছাড়া চল্লিশ এবং পঞ্চাশ দশকে ‘ইস্পাত’ এবং ‘অঙ্গীকার’ নামে তাঁর দু’টি কাব্যগ্রন্থ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। তিনি হুমায়ুন কবিরের ভূমিকা সম্বলিত ‘দারোগা’ ও ‘আগামীকাল’ নামে দুটি নাটকও লেখেন। ১৯৪৬ সালে ‘বিষের নেশা’ নামের একটি উপন্যাসও লিখেছেন। ১৯৪৭ সালে লিখিত তাঁর পুস্তিকা ‘বিপ্লব’ তদানিন্তন ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ কবিতার পাকিস্তান সরকার বাজেয়াপ্ত করে এবং তার নামে হুলিয়া বের হয়। ১৯৫৬ সালে ‘মিশরের মুক্তিযুদ্ধ’ নামে আরো একটি পুস্তিকা চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয়।

এছাড়াও তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- কাব্যগ্রন্থ সূর্যাস্তের রক্তরাগ, সূর্যের ভোর, গরাদভাঙার সংগ্রামীরা জাগো, অদর্শনা, ক্লান্ত বাঁশির সুর, এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে, শিশু-কিশোরদের জন্য ছড়ায় ছড়ায় নামের একটি ছড়ার বই: প্রবন্ধ সংগ্রহ সংস্কৃতি: জাতীয় মুখশ্রী, গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র, স্বৈরতান্ত্রিক গণতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্তি, আলোর সন্ধানে দেশ এবং স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘স্মৃতির সন্ধানে’।

১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমী তাঁকে ফেলোশিপ প্রদান করে সম্মানিত করে ২০০১ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন তাঁকে একুশের পদক ও সংবর্ধনা প্রদান। তিনি ৩য় স্বাধীনতা বইমেলা পুরস্কার (২০০৪), চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব সম্মাননা পদক (২০০০), সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট (২০০২), চট্টগ্রাম সমিতির পক্ষ থেকে সংবর্ধনা ও পদক পেয়েছেন (২০০৩)। এছাড়াও তিনি বহু সংবর্ধনা ও পদক লাভ করেন। ২০০৬ সালে জাতীয়ভাবে তাঁর জন্মদিন পালন করা হয়। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে। ব্যাপক কর্মকান্ডের মাধ্যমে তিনি চল্লিশ এবং পঞ্চাশ দশকে পূর্ব বাংলায় হয়ে উঠেছিলেন একজন কিংবদন্তি পুরুষ।