জানেন তো মহিমান্বিত শবে বরাতের গুরুত্ব ও তাৎর্পয

 

জানেন তো মহিমান্বিত শবে বারাআতের গুরুত্ব ও তাৎর্পয
জানেন তো মহিমান্বিত শবে বারাআতের গুরুত্ব ও তাৎর্পয

চট্টগ্রাম অফিস:

অসংখ্য দরুদ ও সালাম বিশ্বনবী, দু’জাহানের বাদশা হুজুর পুরনূর হযরত মুহাম্মদ মোস্তাফা আহমদ মোজতবা সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর। যার নূরাণী কদমের ও সীলায় মেরাজ, ঈদুল ফতির-ঈদুল আযহা, ক্বদর ও বরাতের মত মহিমান্বিত রজনী আমরা পয়েছি।

মাহে শাবান আরবী হিজরী সনের অষ্টম (৮ম) মাস। আর এই মাসেই রয়েছে বছরের শ্রেষ্ঠতম পঞ্চম রজনী অন্যতম লাইলাতুল বারাআত বা শবে বারাআত। পবিত্র হাদীসে পাকে যার পরিচয় “লাইলাতুন নসিফে মনি শাবান” র্অথাৎ শাবান মাসের চৌদ্দতম দিবাগত রজনী বারাত। আর শাবান আরবী শব্দের অক্ষর পাঁচটি।

ইসলামী মনীষা ও র্দশনকিগণ এই ৫টি অক্ষর  তথা ১. শীন ২. আইন ৩. বা ৪. আলিফ  ও ৫. নুন এর আক্ষরিক অর্থ ও তাৎপর্য তুলে ধরেছেন এভাবে -(১) শীন: দ্বারা শরীফ বা মর্যাদা অর্থ নিয়েছেন। র্অথাৎ এ মাস অতীব র্মযাদার্পূণ। (২) আইন: দ্বারা উলুবু তথা সু-উচ্চ উন্নিতর বাহন র্অথাৎ আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে পরকালীন ও আধ্যাত্মিক উন্নিতর উচ্চ শিখর অর্জণ করতে সক্ষম হয়/হ‘বে। (৩) বা দ্বারা:বিররু অর্থ পূর্ণতা ও নেক আমল অর্থাত এ মাসে পরিপূর্ণ নেক আমল বা পূণ্যময় কাজ করার সুযোগ রয়েছে।(৪) আলিফ : দ্বারা ‘উলফত’ র্অথ ভালবাসা অর্থাত আল্লাহ ও বান্দার ২ জনের মধ্যে ভালবাসা সৃষ্টি ও বৃদ্ধির প্রবণতা থাকতে হয়। (৫) নুন: দ্বারা নুর বা আলো,অর্থাত এমাসে আল্লাহর দয়া, রহমত ও কল্যাণে এবং মহানবীর (দ.) ওপর দরুদ-সালাম পাঠের মাধ্যমে বান্দার অন্তরে সৃষ্ট নূর বা আলো ধারণে সক্ষম হয়। (গুনিয়াতুত তালেবীন- ৩৬৫ পৃ.) এই রাতের আরও ১২টি নাম পরিলক্ষিত হলেও মুসলমানদের নিকট এই রাত দু’নামে বেশি পরিচিত। (১) লাইলাতুল বারাআত (২) শবে বারাআত “লাইল” আরবী এবং শব ফার্সী শব্দ, সুতরাং শব্দদ্বয়ের অর্থ রাত বা রজনী। আর “বারাআত” শব্দরে প্রকৃত অর্থ পৃথক হওয়া, দূর হওয়া ইত্যাদি। অর্থ হয় পৃথক হওয়ার রাত বা দূর হওয়ার রজনী। একে আবার মানব জাতির ভাগ্য নির্ধারণী বা বাজেট বরাদ্দের রাতও বলা হয়। যেহেতু এই মহান রাতে মানুষরে জীবনের সামনের এক বছরের বয়স, রিজিক এবং কে জম্ম গ্রহণ করবে আর কে মৃত্যু বরণ করবে আল্লাহর তায়ালার নির্দেশে নির্ধারণ করা হয় বিধায় শাবান মাসের চৌদ্দ (১৪ তম দবিাগত) রজনীকে শবে বারাআত বা বন্টনরে রজনী বলা হয়। (গুনয়িাতুত তালবেীন) মহাগ্রন্থ আল কুরআনেও এই রাতের প্রতি নির্দেশ করে সহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ইন্না আনজালনাহু ফি লাইলাতুম মুবারাকা র্অথাৎ “নিশ্চয় আমি (কুরআন মজিদকে) নাজিল করেছি বরকতময় রাতে : ‘লাইলাতিম মুবারকা’র তাফসীরে মুফাস্সরিগণ যেমন সাহাবীয়ে রাসূল প্রখ্যাত মুফাস্সরি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:), হযরত ইকরামা (রা:), হযরত আবু হুরাইরা (রা:) সহ অনেকেই বলেছেন, ‘লাইলাতিম মুবারাকা’ দ্বারা চৌদ্দই শাবান দিবাগত রাত বা শবে বারাআতকে বুঝানো হয়েছে। তাফসীরে দুররে মনসুরে উল্লেখ রয়েছে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) কুরআনের শপথ করে বলেছেন “লাইলাতুম মুরাবাকা হলো মাহে শাবানের চৌদ্দতম দিবাগত রাত্রি।(খ:৭, পৃ:৪০১) অন্যদিকে তাফসীরে কাশফুল আসরারে আল্লামা হযরত খাজা আনসারী (রা:) বলছেনে, “এই রজনীতে খায়রে-বরকত, রহমত-কাল্যাণে পরপূর্ণ থাকে, বান্দা যা প্রার্থনা করে তা দোয়া হয়, বান্দার প্রার্থণা-দোয়া কবুল করা হয়, সারা রাত সকল আসমানের রহমতের দরজা সমূহ এবং জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেয়া হয় বলে লাইলাতুম মুবারাকা বলা হয়” (৭ম খন্ড)। আর হাদিসে পাকে রাসূলে মাকবুল (দ.) “নসিফে শাবান” শব্দদ্বয় উল্লেখ করে বস্তুত শবে বারাতকে সম্বোধন/ইঙ্গিত করেছেন। অর্থাত:- প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনস ইবনে মালেক (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করিম (দ.) ইরশাদ করেছেন- “শাবান মাসের পরর্বতী মাস রমযানের অসংখ্য কল্যাণ ও বরকত হাসিল তথা অর্জনের (আল্লাহর কুদরতরে) দরজা সমূহ খুলে দেয়াা হয় এজন্য শাবানকে শাবান করে নামকরণ করা হয়েছে। আর রমজানকে রমজান করে নাম রাখার কারণ হল এই মাসে মানুষের গুনাহ সমূহ জ্বালিয়ে ধ্বংস করা হয়। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (রা:) তার লিখিত “মা সাবাতা বসি-সুন্নাহ” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- “লাইলাতুম মুবারাকা বা বরকতময় রজনী দ্বারা শবে বরাআতই উত্তম। তার পরও কেউ যদি তর্ক করে বলেন- তা দ্বারা শবে ক্বদরকে বুঝানো হয়েছে, তবুও অসুবিধা নেই। কারণ আল্লার রসূল (দ.) নিজেই এই মহান রজনীর ফজিলত তথা গুরুত্ব বর্ণনা করায় এই রজনীর মর্যাদা শঠতার চোখে খাটো করে দেখা প্রকৃত মুমিন-ইমানদার মুসলিমের উচিত নয় এবং বিদ্রুপকারীদের অস্বীকার করার জোর নেই।  রাসূল (দ.) এই শাবান মাসকে নজিরে মাস বলে ঘোষণা করছেনে। আর এই মাস আল্লাহর মাস “রজব” এবং আল্লাহর বান্দা ও রাসূল (দ.) এর উম্মতের মাস “রমযানে’র মধ্যবর্তী হওয়ায় আলাদা এক ফজিলত ও র্মযাদা দান করেছেন।

শবে বারাআতের ফজিলত ও তাৎপর্য্য সম্পর্কে বহু হাদীসে পাক রয়েছে। ফজিলতের মধ্যে রয়েছে- বান্দার গুনাহ ক্ষমা ও প্রার্থনা কবুল হওয়া, কল্যাণ ও রহমতের দ্বার সমূহ বান্দার জন্য খুলে দেয়া ইত্যাদি। মাগফিরাত তথা ক্ষমা ও দোয়া কবুল হওয়া সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (দ.) হাদীস/বাণী “হযরত ওসমান ইবনে আবুল আস (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন- মহানবী (দ.) ইরশাদ করেছেন- শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রজনীতে প্রথম আসমানে একজন ফেরেশতা আহ্বান করে ডাকতে থাকেন ‘ কেউ কি কোন ফরিয়াদ বা প্রার্থনা করার আছ? করলে তা কবুল বা গ্রহণ করা হবে। ফলে যা চাওয়া হবে তা প্রদান করা হবে। (সুনানে বায়হাকী) আর কল্যাণ ও রহমত সর্ম্পকে আল্লাহর রাসূল (দ.) হাদীস। যেমন ইরশাদ হচ্ছে- হযরত মা আয়েশা (রা:) বলেন- হুজুর (দ.) কে আমি বলতে শুনেছি তিনি ইরশাদ করেন- সারা বছরের মাত্র চার রাতে আল্লাহ পাক কল্যাণের দরজা সমূহ খুলে দেন। তা হলো ‘কুরবানী ঈদের রাত, আরাফার রাত (৮ই জলিহজ্ব দবিাগত রাত), ঈদুল ফিতরের রাত এবং শাবান মাসের চৌদ্দতম রজনী, যে রজনীতে মৃতের তালিকা, বান্দার রিজিক নির্ধারিত করা এবং কারা হজ্জ-বিয়ে করবে তাদের তালিকা ও তৈরি করা হয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ- ১০০ পৃ.)

নাজহাতুল মাজালিসে উল্লেখ রয়েছে- এ রাতে আল্লাহ জিব্রাইল (আ.) কে বেহেশতে প্রেরণ করেন এবং তিনি বেহেশত কে সুসজ্জিত হতে নির্দেশ দেন। আর আল্লাহ এই রাতে আকাশের তারকা এবং জমিনের দিবারাতের  সংখ্যানুযায়ী অগণিত বান্দাকে জাহান্নাম হতে মুক্তি দনে। অন্য হাদীসে এসেছে এই রাতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অসংখ্য রহমতের দরজা সমূহ খুলে দেন। যেমন হযরত আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন- মহানবী (দ.) ইরশাদ করেছেন- এই রাতে জিব্রাঈল আমার কাছে আসেন এবং বলেন হে মুহাম্মদ (দ.) আকাশের দিকে আপনার মাথা মুবারক উঠান, আমি বলি এ রাতে কি হচ্ছে? জব্রিাঈল (আ.) বলেন- এ রাতে আল্লাহ তার রহমতের তিনশ (৩০০) দরজা খুলে দেন এবং অসংখ্য গুনাগারকে ক্ষমা করেন। অপর এক হাদীসে পাকে এসেছে- ‘জিব্রাঈল (আ.) রাতের এক চর্তুথাংশে এসে মহানবী (দ.)কে  বলেন- হে মুহাম্মদ (দ.) আপনার মাথা মুবারাক উঠান আমি উঠিয়ি দেখি বেহেশতের আট দরজাই খুলে দেয়া হয়েছে। প্রথম দরজা থেকে অষ্টম দরজা পর্যন্ত আট জন ফেরেশতা আটটি সুসংবাদ প্রদান করেন। যথাক্রমে ১. যে রুকু করবে, ২. যে সিজদা করবে, ৩. যে দোয়া করবে, ৪. যারা আল্লাহর জাকির করবে, ৫. যারা চোখের পানি ছেড়ে দিয়ি কাঁদবে, ৬. যারা আল্লাহর সামনে নিজেকে সর্ম্পূণভাবে আত্মসমর্পণ করবে তাদের জন্য সুসংবাদ, ৭. কোন র্প্রাথী আছ কি? যা চাইবে দেয়া হবে,৮. গুনাহ ক্ষমা র্প্রাথী আছ কি? তাকে ক্ষমা করা হবে।আর রহমত ও জান্নাতের দরজা সমূহ ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত খোলা থাকবে। ফলে বনু ক্বলব গোত্রের অসংখ্য বকরীর লোম-সম-সংখ্যক জাহান্নামী বান্দাকে আল্লাহ মুক্তি দেবেন। এত রমহতের ফলেও যারা গুনাহ হতে ক্ষমা পাবে না সে হতভাগ্যরা হলো শিরিককারী, যাদুকর, গনক, ব্যভিচারক, সুদখোর, মদপানকারী, মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, আত্মীয়তা সর্ম্পক ছিন্নকারী এবং মুসলিম ভাইয়ের সাথে ঝগড়া-বিবাধকারী। হযরত আবু সিদ্দিকি (রা:) বলেন- আল্লাহ এই রাতে মুশরিক এবং হিংসুক ছাড়া অন্য গুনাগারদের ক্ষমা করেন (বায়হাকী শরীফ)।  শবে বারাআতের

আমল। এই রাতে ও পরদিন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময় আমল রয়েছে। তার মধ্যে নফল রোজা, নফল ইবাদত, কোরাআন তেলাওয়াত, কবর যিয়ারত, জিকির আজকার, দান-খায়রাত করা ইত্যাদি। নফল সালাত আদায় শবে বারাআতের অন্যতম আমল তৎমধ্যে সালাতুস তাসবির নামায। শবে বারাআতরে নামায নির্ধারিত না থাকায় যত অধিক নফল সালাত আদায় করা যায় তত বশেি সওয়াব হবে।তবে কম পক্ষে বার রাকাআত নামায আদায় সর্ম্পকে মহানবী (দ.) বলেছেন, এ রাতে বার রাকাআত নফল নামায আদায় করবে এর প্রতি রাকাআতে ১ বার সূরা ফাতিহার সাথে ১০ বার সূরা ইখলাছ পড়বে এর বদৌলতে আল্লাহ তার জীবনের গুনাহ ক্ষমা করে বরকত দান করবেন (নাজহাতুল মাজালসে)। নফল রোজা ও আদায়/রাখা যায়। রাসূল (দ.) এ মাসে অধিক রোজা রাখতেন। তিনি বলেন- রাতে নামায ও ইবাদত বান্দেগীতে কাটাবে, দিনে রোজা রাখবে। রোজা কমপক্ষে দুটি রাখার নির্দেশ দিয়েছেনে ১৪ ও ১৫ তারখিে, যেহেতু আহলে কিতাবগণ একটি রোজা রাখার নিয়ম চালু করেছিল। শাবানের ১৫ তারিখ যে ব্যক্তি রোজা রাখবে তার জীবনের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করা হবে এবং তাকে জাহান্নামের আগুনও র্স্পশ করবে না। এ রাতে কোরআন তিলাওয়াত অন্যতম প্রধান আমল যেহেতু  কুরআন নাজিল হওয়ায় এই রাতের এতোই মর্যাদা, তাই যত বেশি সম্ভব কোরআন তেলাওয়াত করা অত্যন্ত সওয়াবজনক। আর শরীয়ত সম্মত পন্থায় মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, পীর-আউলয়িা ও বুর্জগদের কবর জিয়ারত করা অতি সওয়াবের যহেতেু রাসূলুল্লাহ (দ.) এ রাতের গভীরে নিদ্রাত্যাগ করে জান্নাতুল বাকিতে অবস্থিত সাহাবায়ে একরামের কবর জিয়ারতে ছুটে গিয়েছিলেন যার বর্ণনা হাদীসে পাকে পাওয়া যায়। শবে বারাআত ও শবে ক্বদরের রাতে রাসূল (দ.) মা আয়শা সিদ্দিকা (রা:) কে যে দোয়াটি বেশি পড়তে বলেছেন- “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুব্বুন কারীমুন রাহীমুন তুহব্বিুল আফওয়া ফা-য়াফো আন্নি ইয়া গাফুর  ইয়া গাফুর”। সাথে যত বেশি আল্লাহ তা’আলার জকিরি ও নবীর প্রতি দরুদ-সালাম, দান-খয়রাতও অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। আমাদের সমাজে মিল্লাদুন্নবী (দ.), আশুরা, শবে মেরাজ, ঈদুল আজহা-ফিতর, রমজান ইসলামী সংস্কৃতিতে মুসলমানদের অন্তরে দ্বীনি মান-মানসকিতা সৃষ্টিতে অনন্য ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখে আসছে । তবে কিছু নামধারী মুসলমান-ফেরেশতার মত কথা বলে, শয়তানরে মত ধোকা দিয়ে এসব বরকতময় রাতে দিনে বিশেষ ইবাদত করাকে কোরআন-হাদীসের বিপরীত বলে তা পালন না করার অপপ্রচার করে অপপ্রয়াস ও অপচেষ্টা চালায়। তবে শরীয়ত বিরোধী কাজ হলে তা বন্ধ করে কোরআন হাদীসের আলোকে তা পালন করা প্রয়োজন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে এই মহিমান্বিত রজনীর গুরুত্ব-র্মযাদা অনুধাবন করার তওফীক এবং তা পালনের মধ্য দিয়ে এই রাতের বরকত-ফজলিত ও শরাফত দান করুক।