মর্নিংসান২৪ডটকম Date:২২-০৮-২০১৬ Time:৩:১৪ অপরাহ্ণ


স্মৃতিতে সরষে ইলিশ

স্মৃতিতে সরষে ইলিশ

 কমল দাশ :       

র্অতীত বড় মধুর। বড় মধুর সব স্মৃতি।স্মৃতিতে সরষে ইলিশ। পদ্মা-গঙ্গা  একাকার! র্বষাকাল ও ইলশি ধরার উপযুক্ত সময়। সমুদ্রে ইলশি ধরার  জন্য জেলেরা সাধারণত ইলিশ   চান্দি, টানবেড়, জগৎবেড় প্রভৃতি জাল ব্যবহার করে। ইলিশের মৌসুমে র্পযাপ্ত ইলিশ ধরা পড়লে জেলেদের মুখ হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠে। সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যেও আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। তখন ঘরে ঘরে নানা বৈচিত্রের রান্না করা হয় নানা পদের ইলিশ। ভাপা ইলশি, র্সষে ইলিশ, নোনা ইলিশ, ভাজা ইলিশ-সবই ইলিশ রান্নার প্রকারভদে। তারপর আশ্বিনে এক সময় ইলিশের মৌসুম শেষ হয়ে যায়। জেলেদের মাছ ধরার উদ্যমেও কিছুটা ভাটা পড়ে। তখন আবার শুরু হয় অপেক্ষার পালা। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত লেখক মানকি বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন : ‘ইলিশের মৌসুম শেষ হইলে মোটা উর্পাজনের সুযোগ দু’দিন পর ফুরাইয়া যাইবে। তাই  জেলে পাড়ার কোন ঘরে আজ বুঝি সমর্থদহে পুরুষ নাই; পদ্মার বুকে নৌকা ভাসাইয়া ছড়াইয়া  গিয়াছে দূর-দূরান্তে। কেহ ফিরিবে প্রভাতে, কেহ ফিরিবে না। ঝড় শুরু  হইলে ঘরে ঘরে মেয়েরা উঠানে পিড়ী পাতিয়া দিয়াছেণ্ড ঝড়ের দেবতা সেখানে বসিবেন,শান্ত হইবেন।”    পদ্মা থেকে চাঁদপুর ঘাট রুপোলি শস্যের প্রেমে সোনালী সব দিন। হতে হবে এমন, খাওয়ার পরেও হাতে থেকে যাবে তার সুবাস। দেড কিলোর কম হলে শিল্পের অপমান। সব গল্পেরই একটা শুরু থাকে। আর গল্প যখন, তার সমাপ্তিও অবস্যম্ভাবী। তা, ইলিশ যে এ ভাবে গল্প হয়ে যাবে একদিন, আমার হাতে লাখো হবে বাঙালির জীবনে ইলিশের অবিচুয়ারি, ভাবিনি, ভাবতে পারিনি।জীবন থকেে জীবন চলে গেলে যতটা কষ্ট, ইহকাল থেকে ইলিশ চলে যাওয়া তো প্রায় তাই। খবরের কাগজ খুলুন, টিভির চ্যানেলেও এই শোক কেই বা গোপন রাখতে পেরেছেন? বাড়ির বড়দের কাছে এর পর ছোটরা শুনবে সেই গল্প। গল্প ভাপা ইলিশ, র্ভতা, মুইঠ্যা বা পাড়াজাগানো গন্ধে সাড়া তোলা সে ম ম করা স্মৃতি।

unnamed

ফিসারিঘাট বাজারের ইলিশ র্মাচেন্ট বাবলু দাসের মুখেও সেই গল্প। ‘যেটুকু জোগান, স্যার, পদ্মাপার থেকেই আসছে।  তাও, ওজনে মেরেকেটে আটশো। কোথায় হারিয়ে গেল কিলো কিলো ইলিশের দিন। এখন বললে  স্রেফ গল্প বলে মনে হয়।’ বাঙালরি জীবন থকেে অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে। নবতম, এই ইলিশ। অতীত হয়ে যাওয়া এই বিষয়, বাঙালি যাকে আদর করে বলে  নস্টালজিয়া। আর, খেয়াল করে দেখবেন, বাঙালিই বলে, বাঙালিরাই নাকি বড় নস্টালজিক। জীবনানন্দ যেমন ফিরে যেতে চেয়েছিলেন ধানসিড়িটির তীরে, বাবলুদা  ফিরতে চান বড় জোর বছর দশেক আগে। ‘আজ যদি হঠাৎ করে ২০০ কিলোর একটা বরাত পাই, দু’বার ভাবতে হয়, অর্ডারটা নেব কি নেব না! দশ বছর আগেও, এই জুলাই মাসের শেষে দাঁড়িয়ে কিন্তু সেই নিয়ে ভাবতে হত না।’ ভাবতে হচ্ছে আমাকেও। পাতে ইলিশ না থাকলে বাঙালি আর কী নিয়ে বলবে, ওহ!

বাংলা….আর কী এমন স্বাদ যা ভোলাবে ইলিশরে সেই অনুপস্থিতি। বাঙালির জীবনে এখন বৃষ্টি নেই।  ফিস্টিও নেই। এই ছিটেফোটা র্বষাতে এখন খিচুড়ি একা,ইলিশ, তুমি যেখানেই থাক, সত্বর বাংলায় ফিরিয়া আইিস, তোমার প্রাণরে বন্ধু খিচুড়ি তোমার জন্য অপেক্ষা করিতেছে।  ছোট ইলিশ ধরলে যেমন পরে বড় ইলিশের জোগানে টান পড়ে, তেমনই  ইলিশের বংশবিস্তারও যায় থমকে। পলি জমে গঙ্গার গভীরতা কমে  যাওয়া, ইলিশের আমদানির পথে এক বড় বাধা। ৫০০ গ্রামের কম ওজনের ইলিশ ধরা, কোন বা বেচা এখন তাই সংগত কারণেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ইলিশ নিয়ে গল্পের শেষ নেই। টেনুয়ালোসা ইলিশি নিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলির পঞ্চতন্ত্রে অনেক গল্প। তার নামও নানা। পার্সিরা যাকে ডাকে বিম, গুজরাতিরা মদার-আমরা তাকেই ভালবেসে ডাকে ইলিশ। স্বাস্থ্যগুণেও লা-জবাব এই মৎস্যরাজ। ব্রেন বা নার্ভর জন্য ইলিশ খুবই উপকারী। এমনকী হার্টের পক্ষেও ভাল। তাছাড়া, এত আমরা সবাই জানি, যে কোনও মাছের মতোই নিয়মিত ও পরিমিত ইলিশসেবনে চোখও ভাল থাকে। গুণাগুণের কথা থাক। দোষের কথা বলি। আর দোষ তো একটাই। ইলিশলোভ। যে লোভের

শিকার হননি, এমন বঙ্গসন্তান বিরল। এ এক ধরনের ফাঁদ। যাতে শুধু বাঙালিরাই নন, অবাঙালি এমনকী অভারতীয়রাও ধরা দিয়েছেন যুগ যুগ ধরে।

unnamed

গল্প ফুরোয়। ফুরোয় না ইলিশের গল্প। একবার শুরু হলে, তার শেষ নেই। মুড়ো থেকে ল্যাজা কিছুই যায় না ফেলা। ইলিশের গল্পের মহিমা এমনই। যেখানেই কামড়, সেখানেই চমক। আর সবচেয়ে বড় চমক, বাঙালির পাত থেকে তার নিরুদ্দেশ যাত্রায়। আমরা কত কিছুর জন্যই তো প্রার্থনা করি।বৃষ্টির জন্য, নতুন কিছু সৃষ্টির জন্য। আসুন, সমবেত হয়ে ডাকি সেই মীনদেবতাকে বলি, আয়, হিলসা ঝেঁপে বরষা

                                                                                                                               দেব মেপে…