২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ৭ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

গুলশানের সেই বাড়ি রাজউকের নিয়ন্ত্রণে

Thursday, 08/06/2017 @ 11:33 am

গুলশানের সেই বাড়ি রাজউকের নিয়ন্ত্রণেনিজস্ব প্রতিবেদক : উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের দখলে থাকা গুলশানের সেই বাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে গুলশান এভিনিউয়ের ১৫৯ নম্বর হোল্ডিংয়ের একতলা ওই বাড়িতে রাজউকের অভিযান শুরু হয়। এ সময় ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও র‌্যাব সদস্য। প্রস্তুত রাখা হয় পুলিশের সাঁজোয়াযান, জলকামান, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। রাজউকের দায়িত্বেই এ বাড়ির আসবাব বা মালামাল স্থানান্তর করা হয় মওদুদেরই গুলশান এলাকার অপর একটি ফ্ল্যাটে। রাত ৮টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চলছিল।

এদিকে বাড়িতে উচ্ছেদ অভিযান শুরুর প্রায় ৩ ঘণ্টা পর সেখানে আইনজীবীর পোশাক পরিহিত অবস্থায় উপস্থিত হন মওদুদ আহমদ। অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে কিছু সময় উচ্ছেদ অভিযান দেখেন তিনি। যদিও মামলায় হেরে যাওয়ার পরও বাড়িটি ছাড়বেন না বলে এর আগে তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন। তবে অভিযানকালে তিনি বাধার সৃষ্টি করেননি। সাংবাদিকদের ডেকে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান তিনি। এ সময় মওদুদ আহমদ বলেন, ‘দেশে যে আইনের শাসন নেই এটাই তার প্রমাণ। অবশ্য ওই বাড়ির ‘ভাড়াটিয়া’ দাবি করে বুধবার ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে একটি দেওয়ানি মামলা করেছেন মওদুদ আহমদ।

সরেজমিন বুধবার দুপুরে দেখা গেছেÑ একতলা সাদা রঙের বাড়িটি ঘিরে কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মোতায়েন ছিল বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য ও জলকামান, প্রিজনভ্যান, সাঁজোয়াযান ও বুলডোজার। রাজউকের দুইটি বড় ট্রাকে বাড়ির মালামাল উঠানো হচ্ছিল। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এর আগেই বাড়িতে অভিযান শুরুর প্রথমেই গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়।
রাজউকের পরিচালক খন্দকার অলিউর রহমান বলেন, ‘এটা এখন রাজউকের সম্পত্তি। দীর্ঘদিন ধরে তারা (মওদুদ আহমদ) দখল করে রেখেছিলেন। আদালত আমাদের পক্ষে রায় দিয়েছেন। আমরা দখলমুক্ত করতে এসেছি।’ তিনি জানান, বুধবার দুপুর ১২টার দিকে গুলশান এভিনিউয়ের ১৫৯ নম্বর হোল্ডিংয়ে ওই বাড়িতে তাদের অভিযান শুরু হয়। বিকাল ৩টার পরপরই আইনজীবীর পোশাকে গাড়িতে করে বাড়ির সামনে উপস্থিত হন মওদুদ আহমদ। বাড়ির সামনে অসহায় দাঁড়িয়ে অভিযানে অশংগ্রহণকারীদের উদ্দেশে বলতে থাকেন, ‘দেশে যে আইনের শাসন নেই, এটি তারই প্রমাণ।’ কিছু সময় পরেই সাংবাদিকদের ডেকে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেখেন, কীভাবে আমার মালামাল তুলে নিচ্ছে! এটা প্রতিহিংসার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত। রাজউকও উচ্ছেদের নোটিশ দেয়নি। বিরোধী দলের রাজনীতি করি বলেই বাসা থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। সরকারি দলের নেতা হলে তো এমন হতো না।’ এ অবস্থায় এখন কী করবেনÑ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মওদুদ বলেন, ‘আমি কী করবÑ কী করার আছে? রাতে ফুটপাতে শুয়ে থাকা ছাড়া কী করার আছে! জোরের বিরুদ্ধে, বেআইনি শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের মতো নাগরিকদের করার আর কী থাকে? এখন তো রাস্তায় শুয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই।’
প্রায় ৩০ বছর ধরে ওই বাড়িতে বসবাস করে আসছিলেন মওদুদ আহমদ। তিনি যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে রাজউকের কর্মীরা ওই বাড়ি থেকে মালামাল সরিয়ে নিচ্ছিলেন। এসব দৃশ্য অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন এ সাবেক মন্ত্রী।
বুধবার রাত ৮টার দিকে গুলশান থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, দুপুর থেকেই রাজউকের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান চলছে। পুলিশ সেখানে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছে। অভিযান অব্যাহত আছে। এটা রাজউকের কর্মকা-ের ওপর নির্ভর করছে।
ভাড়াটিয়া দাবি করে আদালতে মওদুদের মামলা : আদালত প্রতিবেদক জানান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ রাজধানীর গুলশানের বাড়ির ভাড়াটিয়া দাবি করে বুধবার ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে একটি মামলা করেছেন। আরজিতে তিনি বলেছেন, ১৯৮১ সালে তিনি ভাড়াটিয়া হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হন, তখন থেকেই বাড়িটি তার দখলে আছে। বাড়িটি ভাড়া নেয়ার পর প্রায় ২ কোটি টাকার বেশি অর্থের উন্নয়ন কাজ করেছেন তিনি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, ঢাকা জেলা প্রশাসন যাতে বাড়িটি দখল করতে না পারে, সে জন্য ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া হিসেবে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন তিনি। মামলার আরজিতে আরও বলা হয়, পাকিস্তানের নাগরিক মোঃ এহসান তৎকালীন বিআইটি বর্তমান রাজউকে এলটমেন্ট বা বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেন। বিআইটি মোঃ এহসানের স্ত্রী জার্মান নাগরিক ইনজি সøøাজের নামে বাড়িটি বরাদ্দ দেন। ১৯৮১ সালে গুলশানের ওই বাড়ির মালিক ইনজি সøাজ প্রয়াত প্রধান বিচারপতি মাইনুর রেজা চৌধুরীকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (আমমোক্তারনামা) করে দেন। পাওয়ার অব অ্যাটর্নির ক্ষমতা ১৯৮৪ পর্যন্ত বহাল ছিল। বুধবার ১১টার দিকে করা মামলায় এহসান-ইনজি দম্পতির ছেলে করিম ফারনাজ সোলাইমান, রাজউক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ঢাকা জেলা প্রশাসককে বিবাদী করা হয়েছে। মওদুদ আহমদ নিজেই ভাড়াটিয়া হিসেবে মামলাটি দায়ের করেন। মওদুদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাহেরুল ইসলাম তৌহিদ জানান, মামলাটির নম্বর ৫৬১/১৭। ১৯ জুলাই বিবাদীদের আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন দেয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত রাজধানীর গুলশান-২ এর ১৫৯ নম্বর প্লটের সরকারি বাড়ি অবৈধভাবে দখলে রাখার অভিযোগে ২০১৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও তার ভাই মনজুর আহমদের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেন দুদকের উপপরিচালক হারুনুর রশিদ।

এজাহারে বলা হয়, গুলশানে যে বাড়িতে মওদুদ আহমদ বসবাস করছেন সেই বাড়ির প্রকৃত মালিক ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক মোঃ এহসান। পাকিস্তান আমলে বাড়িটির মালিকানার কাগজপত্রে এহসানের স্ত্রীর নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা বাংলাদেশ ত্যাগ করলে ১৯৭২ সালে এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকা সরকারি মালিকানাভুক্ত হয়। ১৯৭৩ সালের ২ আগস্ট ভুয়া আমমোক্তারনামা দেখিয়ে ব্যারিস্টার মওদুদের ভাই মনজুর আহমদ ওই বাড়িটি সরকারের কাছ থেকে বরাদ্দ নেন। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকারের মন্ত্রী থাকার সুবাদে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ওই বাড়িটিতে বসবাস শুরু করেন। এরপর ২২ বছরে অনেকবার সরকার পরিবর্তন হলেও তিনি বাড়িটি দখলে রাখেন। ১ বিঘা ১৩ শতক ১৪ ছটাক জায়গাজুড়ে বাড়িটি তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তিকে ভাড়া দিয়ে টাকা আদায় করেছেন এবং একপর্যায়ে জমিসহ বাড়িটি তার ভাইয়ের কাছে রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে বিক্রি করেন। এভাবে তিনি অন্তত ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ মামলায় তদন্ত শেষে গত বছর ২১ মে আদালতে চার্জশিট দেয়া হয়।

২০১৪ সালের ১৪ জুন এ মামলার অভিযোগ আমলে নেন বিচারিক আদালত। অভিযোগ আমলে নেয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মওদুদ আহমদ হাইকোর্টে আবেদন করলে গেল বছর ২৩ জুন খারিজ করেন হাইকোর্ট। পরে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন মওদুদ আহমদ। এদিকে এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ১২ আগস্ট ওই বাড়িটি মনজুর আহমদের নামে মিউটেশন করার জন্য রায় দেন হাইকোর্ট। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি লিভ টু আপিল দায়ের করে রাজউক। ২০১৪ সালের ৯ মার্চ রাজউককে আপিলের অনুমতি দেন আপিল বিভাগ। নিয়মিত আপিল দায়েরের পর চলতি বছর শুনানি শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়। দুইটি বিষয়েই গেল বছর ২ আগস্ট নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত রায় দেন সর্বোচ্চ আদালত। একই বছর ৩০ আগস্ট পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়। এরপর বাড়িটির মালিকানা ফেরাতে রিভিউ আবেদন করেন ব্যারিস্টার মওদুদ। অতঃপর রোববার সেই রিভিও আবেদনও খারিজ হয়ে যায়। ফলে মামলায় জয়ী হয় রাজউক।