ফুল ফুটুক আর না-ই ফুটুক আজ বসন্ত

তোমারে লেগেছে এত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে/ রাতের বাসরে দোসর হয়ে তাই সে আমায় টানে/—–/ আকুল ভ্রমরা বলে সে কথা বকুলের কানে কানে’। তালাত মাহমুদের এই গানের মতো চাঁদ জানুক না জানুক; ভ্রমরেরা বকুলের কানে কানে কথা বলুক না বলুক ফাগুনের প্রথম দিনে পরীরা যেন আকাশ থেকে নেমে এসেছিল ইট-পাথরের রাজধানীর এই মাটিতে।

বাংলা একাডেমী, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, টিএসসি, দোয়েল চত্বর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বকুল তলায় যেন চাঁদ-পরীদের বসেছিল মিলনমেলা। যানজট ও বায়ু দুষনের এই রাজধানী ঢাকায় বসবাসরত মানুষের যান্ত্রিক জীবনে হা-পিত্যেষের অন্ত নেই। সেখানে একদিনের জন্য হলেও লেগেছিল ফাগুনের বসন্ত উৎসব।

বাংলা একাডেমীর বইমেলার আনন্দ বারতা, নারীর খোঁপায় গোঁজা ফুল, টায়রা, হাতভর্তি রেশমি চুড়ি, বাসন্তী শাড়ি পরিহিত ঝাকে ঝাঁকে তরুণীর কলকাকলি দেখে কোনো বাউÐুলে কবি যদি মনের অজান্তে গেয়ে ওঠেন ‘বসন্ত বাতাসে…সই গো /বসন্ত বাতাসে/বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ/ আমার বাড়ি আসে…’ (শাহ আবদুল করিম) তাহলে তাকে কি দোষ দেয়া যায়? জাতীয় কবি কাজী নজরুল তো লিখেছিলেন ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সেকি মোর অপরাধ’। তরুণ নজরুলের এই চাহনিকে সেদিন যদি অপরাধ হিসেবে ধরে নিতাম তাহলে তাঁর মতো ক্ষণজন্মা কবিকে কী আমরা পেতাম?

‘ফুল ফুটুক আর না-ই ফুটুক আজ বসন্ত’ (সুভাষ মুখোপাধ্যায়)। পশ্চিম বাংলার এই কমরেড কবি যখন কবিতাটি লেখেন তখন প্রকৃতি কেমন সাজে ছিল জানি না। তবে এবার বসন্তের প্রথম ফাগুনে সত্যিই প্রকৃতি সেজেছিল বর্ণিল সাজে। শীতের রুক্ষতা ঝেড়ে ফেলে গাছেরা সেজেছে নতুন সবুজ-সজীব পাতায়। এতো বসন্তের আগমনী বারতা! শিমুল-পলাশের ডালে ডালে আগুন রাঙা ফুলের সমাহার। বর্ণিল, আলোক উজ্জ্বল, প্রাণ প্রাচুর্য্যময় ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করতে হৃদয়ের সকল উচ্ছ¡লতা ঢেলে দেয় রাজধানীর তরুণ-তরুণী কিশোর-কিশোরীরা। আহা কিশোরী! তোমার ডাগর ডাগর চোখ!!

বসন্তের প্রথম দিনে পূর্ব আকাশে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী নর-নারীর ঢল নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুল তলায়। বিকেলে বাংলা একাডেমীর বই মেলায়। মেয়েরা বাসন্তী শাড়ি, রঙিন চুড়ি, রঙিন জামা, খোপায় বেলি-গোলাপ ফুল; আহা ! আহা!! আহা !!!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘আহা আজি এ বসন্তে /কত ফুল ফোঁটে কত বাঁশি বাজে/কত পাখি গায়…’। কাজী নজরুল ইসলাম ‘এলো বনান্তে পাগল বসন্ত’। বাংলা ভাষার হাজারো কবি পহেলা ফাগুন ও ঋতুরাজ বসন্তের রুপ-যৌবন-সৌন্দর্যের আবির কবিতা-গীতিতে ছিঁটিয়েছেন। বাংলা ভাষার কবি-শিল্পীদের ফাগুনকে নিয়ে আক্ষেপেরও শেষ নেই।

কণ্ঠশিল্পী তপন চৌধুরীর ‘পলাশ ফুটেছে শিমুল ফুঠেছে/ এসেছে দারুন মাস/ আমি জেনে গেছি তুমি আসিবে না ফিরে/ মিটিবে না পিয়াস—’ এমন মর্মবেদনা কতভাবেই না ফুটিয়ে উঠেছে। ফাগুন তোমাকে ঘিরেই!