দেশে বন্ধের ঘোষণা এলেও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে পোশাক শ্রমিকরা

বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে সংক্রমিত করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সংকটের মুখে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্য তৈরিপোশাক শিল্প। প্রতিদিন এ খাতে দেশের লোকসান শত শত কোটি টাকা। একের পর এক  বাতিল হচ্ছে অর্ডার। এরই মধ্যে এক দশমিক ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্ডার বাতিল হয়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগে সংশ্লিষ্টরা।

দেশের সরকারি-বেসরকারি অফিস, দোকানপাট, পরিবহন বন্ধের ঘোষণা এলেও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছ চলেছেন দেশের কয়েক লাখ তৈরি পোশাক শ্রমিক। তবে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের প্রতিষ্ঠান বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শ্রমঘন পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সচেতনতা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যথাযথ স্বাস্থ্য ঠিক রেখে উৎপাদনে আছে শিল্প-কারখানাগুলো।

অপরদিকে ঝুঁকি বিবেচনায় এনে স্ব-বেতনে কারখানা বন্ধ করার পক্ষে শ্রমিক নেতারা। কিন্তু কারখানা বন্ধ করার কোনো কারণ নেই বলছেন উদ্যোক্তারা। কাজ না থাকলে কেউ কারখানা বন্ধ করতে পারেন, সেটা একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। তবে শ্রমিকের বেতন নির্দিষ্ট সময়ে দিতে হবে বলে মত তাদের।

তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) মতে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে দেশের পোশাকখাতে। বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশ থেকে ক্রেতারা তাদের সমস্ত ক্রয়াদেশ (অর্ডার) আপাতত বাতিল করছেন।

এখন পর্যন্ত এক হাজার ৮৯টি কারখানায় মোট এক দশমিক ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্ডার বাতিল হয়েছে। এ নিয়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে এ খাতে, যা উদ্বেগের।

কারখানা ও শ্রমিকের ঝুঁকি বিবেচনায় এনে স্ব-বেতনে অনন্ত দুই সপ্তাহের ছুটির কথাও বলেন নেতারা। আবার অনেক শ্রমিক নেতা বলছেন, কারখানা চালু থাকলেও শ্রমিকের স্বাস্থ্যের বিষয়টি যথাযথভাবে দেখার পরামর্শ দেন।

প্রতিটি কারখানায় প্রয়োজনীয় উপকরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখার পাশাপাশি কারখানা কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে সচেতন এবং সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তারা।

কারখানা চালু রাখার পক্ষে মালিকরা। তারা বলছেন, কারখানা বন্ধ করার কোনো কারণ নেই, সরকারের দিকনির্দেশনা মেনেই কারখানা পরিচালিত হবে।

কারখানা মালিকদের মতে, শ্রমিকের যথাযথ স্বাস্থ্য ঠিক রেখে উৎপাদনে আছে বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত কারখানাগুলো। কারখানা বন্ধ হলে বেতন-বোনাস নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ হতে পারে। তবে গার্মেন্টস বন্ধ হোক বা না হোক, বেতন বোনাস যথাসময়ের শ্রমিকদের কাছে পৌঁছে যাবে।

এদিকে কারখানার ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করতে একটি ওয়েবপোর্টাল করেছে বিজিএমইএ। সেখানে চার হাজার কারখানার মধ্য থেকে এক হাজার ৮৯টি কারখানাকে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে এন্ট্রি করা হয়েছে।

যেখানে এসব কারখানায় মোট ৮৭ কোটি ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ৬২২টি অর্ডার বাতিল হয়েছে। যার আর্থিক পরিমাণ এক দশমিক ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এসব কারখানার মোট শ্রমিকের সংখ্যা ১২ লাখ।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিটি ফোরামের সভাপতি ও শ্রমিক নেতা মোশরেফা মিশু বলেন, করোনা আতঙ্কে দেশের যানবাহন বন্ধ বরে দেওয়া হয়েছে, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মার্কেট।

দেশের মধ্যে করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। এ অবস্থায় ঝুঁকি মোকাবিলায় কমপক্ষে দুই সপ্তাহ কারখানায় স্ব-বেতনে ছুটি দেওয়ার দাবি জানাই। সাভারে তিনটি কারখানা বন্ধ হয়েছে। যেখানে ১০ হাজার শ্রমিক রয়েছে, অথচ বেতন দেওয়া হয়নি। এটা তাদের আরও যন্ত্রণার মধ্যে ফেলবে।

গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিল্প রক্ষা জাতীয় মঞ্চের সভাপতি শ্রমিক নেতা আবুল হোসাইন বলেন, কারখানা চালু থাকলেও শ্রমিকের স্বাস্থ্যের বিষয়টি যথাযথভাবে দেখতে হবে। প্রতিটি কারখানায় প্রয়োজনীয় উপকরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখার পাশপাশি কারখানা কর্তৃপক্ষকে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে।

এ বিষয়ে বিজিএমইএর সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, করোনা মোকাবিলায় কারখানা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সচেতনতা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ নিজ শ্রমিকদের জন্য হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা, পর্যাপ্ত পানি ও সাবান রাখা, প্রয়োজনে গরম পানি সরবরাহের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থার জন্য বিজিএমইএর কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে চারটি এলাকাভিত্তিক (আশুলিয়া, সাভার ও নবীগঞ্জ, গাজীপুর, শ্রীপুর ও মাওনা, ডিএমপি এলাকা ও নারায়ণগঞ্জ) কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ভয়াবহ অবস্থা চলছে আমাদের তৈরিপোশাক খাতে। বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশ থেকে সমস্ত ক্রেতা তাদের ক্রয়াদেশ (অর্ডার) আপাতত বাতিল করছেন।

তারা বলেছেন স্থগিত, তবে আমাদের জন্য স্থগিত ও বাতিল একই জিনিস। এ পরিস্থিতি উদ্বেগের। তবুও শ্রমিকের যথাযথ স্বাস্থ্য ঠিক রেখে আমরা উৎপাদনে আছি। কাজ না থাকলে কেউ বন্ধ করতে পারেন, তবে বেতন নিয়ম মেনে যথাসময়েই দেয়া হবে।