৪৯ বছরে এই প্রথম শহিদ মিনার খালি যাচ্ছে

শাহরিয়ার মুনির জিসান: বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারি করোনাভাইরাসের কবলে বাংলাদেশও। ঘরবন্দি মানুষ। আতঙ্ক, উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। এমনই এক সময়ে এসেছে দেশের মহান স্বাধীনতা দিবস।
স্বাধীনতার পর ৪৮ বছর ধরে যে দিনটিতে মানুষ শ্রদ্ধার ডালি দিয়ে রাঙিয়ে তুলতো স্মৃতির মিনারকে, সেটি আজ জনমানবহীন। স্মৃতির মিনারে যেন মানুষের শূন্যতার হাহাকার। ঘরবন্দি মানুষ যেতে পারেনি শহিদ মিনারে। দিতে পারেনি ফুল। গানে, কবিতায়, স্লোগানেমুখর হয়ে ওঠেনি স্মৃতির মিনার।
১৯৬২ সালে নির্মিত চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার প্রতিটিজাতীয় দিবসে হয়ে ওঠে জনসমাগমে পূর্ণ। হাজারও সংগঠন, সরকারি-বেসরকারি অফিস, সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন শহিদ মিনারে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের দিন, একুশের প্রভাত ফেরি, স্বাধীনতার প্রথম প্রহর কখনোই ব্যতিক্রম হয়নি।
গত ৪৯ বছরে শুধু এবারই স্বাধীনতা দিবসটি ভিন্নভাবে এসেছে চট্টগ্রামের মানুষের জীবনে, শহিদ মিনারের জন্যও। শহিদ মিনারে যেতে না পারলেও বন্দরনগরীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ অনেকেই নিজের ঘরে উড়িয়েছেন লাল-সবুজের পতাকা।
নিজের বাসায় আলো বন্ধ করে মোমের আলোয় স্মরণ করেছে পঁচিশে মার্চের কালরাতকে। কেউ কেউ স্বল্প পরিসরে নিজেরএলাকায় স্মৃতিস্তম্ভে কিংবা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, স্মরণ করেছেন মাতৃভূমির জন্য প্রাণ বিলিয়ে দেওয়া ৩০ লক্ষ বীর শহিদকে।

সত্তরের দশকের তুখোড় ছাত্রলীগ নেতা চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন বলেন, ‘পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরবর্তী সময়ে ১৬ ডিসেম্বর, ২১ ফেব্রুয়ারি এবং ২৬ মার্চ শহিদ মিনারে যাবার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান।

১৯৭৬ সালের ২৬ মার্চ সকালে আমরা আওয়ামী লীগ অফিসে আসি। দুজন প্রবীণ নেতা অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ এবং ক্যাপ্টেন কাশেমকে রাজি করিয়ে শহিদ মিনারে শপথ পাঠ করাতে নিয়ে যাই। পুলিশ বাধা দেয়। তখন আমরা চারজন শহিদ মিনারে উঠে ফুল দিই।

সামরিক সরকারের নির্দেশ ছিল, চারজনের বেশি শহিদ মিনারে যাওয়া যাবে না, স্লোগান দেওয়া যাবে না। আমি ফুল দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্লোগান ধরি, পুলিশ বাঁশির আওয়াজ দিতেই আমরা শহিদ মিনারের পেছন দিয়ে পাহাড় ধরে কোর্ট বিল্ডিংয়ের দিকে পালিয়ে যাই।’

‘আরেক সামরিক শাসক এরশাদও ক্ষমতায় এসে শহিদ মিনার অবরূদ্ধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু শুরু থেকেই এরশাদের নির্দেশ ছাত্র-জনতা মানেনি। একবার শহিদ মিনারে যাবার জন্য পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও হয়। দু’বারের সামরিক শাসনামলে অনেক চেষ্টা করেও আমাদের শহিদ মিনারে যাওয়া ঠেকানো যায়নি।

গত ৪৯ বছরে এই প্রথম শহিদ মিনার খালি যাচ্ছে। কিন্তু প্রেক্ষাপট ভিন্ন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি শরীরি শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল। এবার যুদ্ধ করছে অশরীরি শত্রুর সঙ্গে। বাঙালি অশরীরি শত্রুকে মোকাবিলা করবে এবং আবার আমরা দৃঢ়চিত্তে আমাদের প্রাণের শহিদ মিনারে যাব, বীর শহিদদের প্রতি সম্মান জানাব।’

আশির দশকের ছাত্র ইউনিয়নের নেতা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অশোক সাহা বলেন, ‘সামরিক শাসক জিয়া ও এরশাদের আমলে আমরা শহিদ মিনারে যেতে বাধা পেয়েছিলাম।

তখন আমরাও ভিন্ন কৌশল নিয়েছিলাম। মিছিল করে যেতাম না। একজন-দুজন করে যেতাম। শহিদ মিনারে ফুল দিতে ওঠার সময় একত্রিত হতাম। কিন্তু জীবিত কালে শহিদ মিনারে যেতে না পারার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখিও হলাম।

যে বাঙালিকে কামান-বন্দুক আটকাতে পারেনি, সেই বাঙালিকে একটি অদৃশ্য ভাইরাস ঘরে আটকে দিয়েছে। আমাদের জন্য এটা একটা নতুন অভিজ্ঞতা।’

‘তবে শহিদ মিনারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এই পরিস্থিতি মেলানো সমীচীন নয়। এটা একটা বৈশ্বিক দুর্যোগ। এটা এমন এক ঘটনা, বিভক্ত মানবজাতিকে আবার এক করে দিয়েছে।

মানবজাতি এক হয়ে লড়ছে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে। একদিন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধেও মানুষ জয়ী হবে। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি থেকে মানবজাতিকে ধর্মীয়-জাতিগত সংঘাতভুলে এক হবার শিক্ষা নিতে হবে।’ বলেন অশোক সাহা।

গত প্রায় ৩২ বছর ধরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোর অনুষ্ঠান পরিচালনা করে আসছেন আশির দশকের ছাত্রলীগ নেতা নগর আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী।

তিনি বলেন, ‘এরশাদের আমলে আমাদের শহিদ মিনারে যেতে বাধা দেওয়া হত। কারণ সামরিক শাসকরা সবসময় শহিদ মিনার, মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান-এসবকে ভয় পেত। তাদের চিন্তাধারা ছিল পাকিস্তানপন্থী।

৮৭ সালে আমরা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে মিছিলের ঘোষণা দিয়েছিলাম। ছাত্রলীগ আর ছাত্র ইউনিয়নই তখন চট্টগ্রাম শহরে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ, সিপিবি, বাসদ ছিল। নন্দনকানন, আমতল, টিঅ্যান্ডটি অফিসের সামনে আমাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘাত হল।

শহিদ মিনার অবরূদ্ধ করে ফেলা হল। কিন্তু এরপরও আওয়ামী লীগ, সিপিবি, বাসদের নেতারা একজন, দুজন করে গিয়ে ফুল দিয়ে আসেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনও গিয়েছিল।

ওয়ান-ইলেভেনের পর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুই বছর সীমিতভাবে আয়োজন করা হয়েছিল। কারণ তখন অনেকেই জেলে ছিলেন।’

‘৮৮ সাল থেকে ছাত্র সংগঠনগুলোর সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমি চট্টগ্রাম শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন উপস্থাপনা শুরু করি। গত ৩২ বছরে এবার প্রথম স্বাধীনতা দিবস শহিদ মিনারে পালন করা যাচ্ছে না।

ব্যক্তিগতভাবে এটা আমার জন্য খুবই দুঃখের অনুভূতি। অনেক সংগঠনের পক্ষ থেকে আমাকে ফোন করে শহিদ মিনারে আসতে পারবে কি না জানতে চাওয়া হচ্ছিল। সহকর্মীরাও অনেকে ফোন করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। যা-ই হোক, আপাতত জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা আমাদের করতে হবে। সবাইকে ঘরে থাকতে হবে’ বলেন সাইমুল।

১৯৭২ সাল থেকে প্রতিটি জাতীয় দিবসে শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে গণসঙ্গীতের আয়োজন করে আসছে উদীচী। ৪৮ বছর ধরে ধারাবাহিক আয়োজনে ছেদ পড়েছে এবার। সাংগঠনিকভাবে চট্টগ্রামে উদীচী সংগঠক ও শিল্পীদের সবাইকে নিজ নিজ বাসায় পঁচিশে মার্চের কালরাত এবং বীর শহিদদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের আহ্বান জানায়।

চট্টগ্রামে উদীচীর প্রতিষ্ঠাকালীন সংগঠকদের অন্যতম ডা. চন্দনদাশ বলেন, ‘জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের আমলে শহিদ মিনারে যেতে বাধা দেওয়া হত।

একবার অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে আহ্বায়ক, রানা দাশগুপ্তকে সদস্য সচিব এবং আমাকে যুগ্মআহ্বায়ক করে একুশে উদযাপন পরিষদ গঠন করা হয়। সেটা ৭৬ সাল।

সামরিক শাসকদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে আমরা শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে আসি। আওয়ামী লীগ, সিপিবিসহ রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ঝটিকাভাবে গিয়ে ফুল দিয়ে আসত। সামরিক শাসনামলেও উদীচী কখনো প্রোগ্রাম বাতিল করেনি।

এবার করোনাভাইরাসের প্রেক্ষাপটের মধ্যেও আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমরা করতে পারিনি। তবে উদীচীর কর্মীদের নিজ নিজ ঘরে শহিদদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের জন্য বলা হয়েছে।’

‘সবকিছুই আসলে সময়ের প্রয়োজনে। সময়ের প্রয়োজনে যুদ্ধ বদলায়। যেমন- আমরা এখন করোনার বিরুদ্ধে একধরনের যুদ্ধে আছি। সেই যুদ্ধের জন্য আমরা শহিদ মিনারে যেতে পারিনি।

একাত্তরে ছিল দেশকে স্বাধীন করার যুদ্ধ। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে সেই স্বাধীনতা এবং দেশকে রক্ষার যুদ্ধ করতে হয়েছে’ বলেন চন্দন দাশ।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সরকার জাতীয়ভাবেও স্বাধীনতা দিবসের সব কর্মসূচি বাতিল করেছে।