কিংবদন্তি অভিনেতা খলিল আর নেই

 indexবিনোদন ডেস্ক: বিশিষ্ট চলচ্চিত্র অভিনেতা খলিলউল্লাহ খান আর নেই। তিনি খলিল নামেই পরিচিত ছিলেন। রবিবার সকাল ১১টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী রাবেয়া খানম, পাঁচ ছেলে ও চার মেয়ে রেখে গেছেন। শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসজনিত সমস্যার কারনে ২ ডিসেম্বর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন অভিনেতা খলিল। হাসপাতালের সিসিইউ বিভাগে ডা. খালেদ মহসিনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন বর্ষীয়ান এই অভিনেতা। চিত্রনায়ক আলমগীর তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানান, রবিবার বিকাল ৩টায় এফডিসিতে প্রথম জানাজা, বাদ আছর মোহাম্মদপুরের নুরজাহান রোড মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মোহাম্মপুর কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হবে। এদিকে অভিনেতা খলিলের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে চলচ্চিত্র অঙ্গনে। খলিলের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে স্কয়ার হাসপাতালে আসেন অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা আত্মার। তার মৃত্যুতে আমার আত্মার একটা অংশ যেন ছিঁড়ে গেল। আমি খুবই মর্মাহত। এখন এ বিষয়ে কিছুই বলতে পারছি না।’
প্রাথমিক জীবন খলিলের জন্মস্থান ভারতেরমেদিনিপুর। তার বাবা পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন তাই থাকে কৃষ্ণনগর, বগুড়া, বর্ধমান, নোয়াখালী যেতে হয়। খলিলের শৈশব জীবন কেটেছিল এসব জেলাতেই।[৪] খলিল ১৯৪৮ সালে সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৫১ সালে মদনমোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেন।[৩] সিলেট এমসি কলেজ থেকে তিনি স্নাতক পাস করেন।
সামরিক জীবন ,১৯৫১ সালে আর্মি কমিশনে যোগ দিয়ে কোয়েটাতে চলে যান। ১৯৫২ সালে ফিরে এসে আনসার এডজুট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন।[৪] দীর্ঘদিন সাসপেন্ড থাকার পর তা উইড্র হয় ১৯৭৭ সালে। ১৯৯২ সালে বয়সের কারণে রিটায়ার করেন আনসার ডিপার্টমেন্ট থেকে।[৩] চলচ্চিত্র জীবন, ১৯৫৯ সালে সোনার কাজল ছবিতে প্রথম অভিনয় শুরু করেন। [৪] ফিল্মে আসার আগে বেশ কয়েকটি নাটকেও অভিনয় করেন। ফিল্মে আসার ব্যাপারে প্রযোজক মাসুদ চৌধুরীর কাছ থেকে সহযোগিতা পান। তার সাহযোগিতায় জহির রায়হানের ‘সোনার কাজল’ ছবিতে নায়ক হয়ে হয়ে যান খলিল। প্রথম ছবিতে দু’জন নায়িকা ছিলেন—একজন সুমিতা দেবী, অপরজন সুলতানা জামান। সোনার কাজল ছবির পরিচালক ছিলেন জহির রায়হান ও কলিম শরাফি। খলিল অভিনীত দ্বিতীয় ছবি প্রীত না জানে রীত। ছবিটি ১৯৬৩ সালের ১৩ জানুয়ারি মুক্তি পায়।[৩] খলিলের তৃতীয় ছবি ‘সংগম’।[৪] এ ছবিতে খলিল ও সুমিতা দেবী রোমান্টিক নায়ক-নায়িকা। এরপর নায়ক হিসেবে তিনি একে একে অভিনয় করলেন—কাজল (১৯৬৫), ক্যায়সে কঁহু (১৯৬৫), ভাওয়াল সন্ন্যাসী (১৯৬৫), বেগানা (১৯৬৬), জংলী ফুল (১৯৬৮) প্রভৃতি ছবিতে। নায়ক হিসেবে খলিলের শেষ ছবি ‘জংলী ফুল’। এটি ১৯৬৮ সালের ২৯ মার্চ মুক্তি পায়। তার নায়িকা ছিলেন সুলতানা জামান। সহ-নায়িকা ছিলেন সুচন্দা। ১৯৭৪ সালে ‘উত্সর্গ’ এবং ‘এখানে আকাশ নীল’ ছবি ২টির মাধ্যমে খলিল চরিত্রাভিনেতারূপে আত্মপ্রকাশ করেন। এস এম পারভেজ পরিচালিত বেগানা ছবিতে প্রথম খলনায়ক হিসেবে খলিল অভিনয় করেন। দু’টি ছবি প্রযোজনা করেছিলেন তিনি। একটি সিপাহী অন্যটি এই ঘর এই সংসার।[৪]
পরিচালনা জীবন ১৯৬৫ সালে চুক্তিবদ্ধ হন ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী’ ছবিতে। [৪] ভাওয়াল রাজার ঐতিহাসিক কাহিনী অবলম্বনে এর চিত্রনাট্য লিখেছিলেন—রওনক চৌধুরী। তিনিই ছিলেন ছবির পরিচালক। ছবিতে ডাক্তার আশুর চরিত্রে ছিলেন খলিল। ছবিতে নায়িকা অর্থাত্ রানীরূপী রেশমার সঙ্গে ছিল তার পরকীয়া প্রেম। ভাওয়াল সন্ন্যাসীর পর ‘উলঝন’ ছবিতে খলিলের নায়িকা ছিলেন রোজী। [৩]
উর্দু ছবিতে ১৯৬৬ সালে ‘বালা’ নামে একটি উর্দু ছবিতে অভিনয় করার অফার পেলেন। [৪] এই ছবিতে জেনিফার নামে একজন অ্যাংলো মেয়ে ছিলেন। তার সঙ্গে জড়িয়ে খলিলের নামে বিভিন্ন কুত্সা রটে। এ কারণে ইচ্ছা করেই খলিল ‘বালা’ ছবির কাজ ছেড়ে দেন।[৩]
টেলিভিশন পর্দায় আশির দশকে টেলিভিশন পর্দা আসেন খলিল। তার অভিনীত বিশেষ নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- আব্দুল্লাহ আল মামুনের ধারাবাহিক নাটক সংশপ্তক।[৪]
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র খলিল অভিনীত ছবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পুনম কি রাত, ভাওয়াল সন্ন্যাসী, উলঝান, সমাপ্তি, তানসেন, নদের চাঁদ, পাগলা রাজা, বেঈমান, অলঙ্কার, মিন্টু আমার নাম, ফকির মজনুশাহ, কন্যাবদল, মেঘের পরে মেঘ, আয়না, মধুমতি, ওয়াদা, ভাই ভাই, বিনি সুতার মালা, মাটির পুতুল, সুখে থাকো, অভিযান, কার বউ, কথা কও, দিদার, আওয়াজ, নবাব ইত্যাদি।[৩]
পারিবারিক জীবন খলিল ১৯৫৪ সালে বাবা-মায়ের পছন্দে মানিকগঞ্জের মেয়ে রাবেয়া খানমকে বিয়ে করেন। তার পাচ ছেলে ও চার মেয়ে।[৩]
মৃত্যু খলিল ২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় ঢাকায় স্কয়ার হাসপাতালে মৃত্যুবরন করেন
চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতিও ছিলেন। কিংবদন্তি অভিনেতা খলিল এ পর্যন্ত প্রায় ৮০০ ছবিতে অভিনয় করেছেন। প্রয়াত পরিচালক আলমগীর কুমকুম পরিচালিত ‘গুন্ডা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এই ছবিতে তার সাথে অভিনয় করেছিলেন নায়ক রাজ রাজ্জাক, আলমগীর কবরীসহ আরো অনেকে। খলিল অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র কলিম শরাফী ও জহির রায়হান পরিচালিত সোনার কাজল। এই ছবিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন সুমিতা দেবী ও সুলতানা জামান। নায়ক হিসেবে খলিল অভিনয় করেছেন কাজল, প্রীত না জানে রীত, জংলী ফুল, বেগানাসহ আরো বেশ কয়েকটি ছবি। চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে তিনি শবনমের সাথে জুটিবদ্ধ হয়েই সবচেয়ে বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হচ্ছে পুনম কি রাত, অশান্ত ঢেউ, ক্যায়সে কাহু, উলঝান, সমাপ্তি, তানসেন, নদের চাঁদ, মাটির ঘর, রাজা, মিন্টু আমার নাম, কন্যা বদল, যৌতুক, আয়না, মাটির পুতুল, আওয়াজ, নবাব ইত্যাদি।