করোনাতেও অলিতে গলিতে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত

রাজপথ প্রায় জনশূন্য এখন। তবে অলি-গলিতে চিত্র বিপরীত। সকাল-সন্ধ্যা চলছে আড্ডা। সামাজিক দূরত্বের বালাই নেই, অনেকেই ঘুরছেন দলবেঁধে। অতি আত্মবিশ্বাসী অনেকের মুখে মাস্ক পর্যন্ত নেই। করোনার কঠিন সময়ে এই অসচেতন মানুষদের অনেকেই উঠতি বয়সের। সোজা কথায় কিশোর তারা, চালায় কিশোর গ্যাং!

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ শঙ্কায় সরকারিভাবে সবাইকে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে বলা হয়েছে। কিন্তু বন্দর নগরীর আলোচিত এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা তা মানতে নারাজ।

করোনার কারণে অপরাধ প্রবণতায় এখনও কিছুটা লাগাম থাকলেও চলাফেরায় তাদের লাগাম পড়েনি। প্রশাসনের সঙ্গে লুকোচুরির ফাঁকে তারা ঠিক ঘুরে বেড়াচ্ছে নগরীর অলি-গলিতে। সাধারণ মানুষ হচ্ছেন শঙ্কিত-বিরক্ত, বাড়ছে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি।

লম্বা ছুটিতে যেভাবে চলছে কিশোর গ্যাং

গত ২৬ মার্চ সাধারণ ছুটি শুরু হওয়ার পর থেকে প্রধান সড়কগুলো অনেকটা জনশূন্য থাকলেও অলি-গলিতে দলবেঁধে ঘুরতে দেখা গেছে কিশোর-তরুণদের। যাদের অনেকেই এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে পরিচিত।

কেউ দিচ্ছে আড্ডা, কেউ খেলছে ক্রিকেট-জুয়া, কারও সময় কাটছে মাদক সেবনে। করোনায় সামাজিক দূরত্ব নিয়ে তাদের যেন কোনো মাথাব্যথাই নেই! বিশেষ করে নগরীর আগ্রাবাদ ও বাকলিয়া এলাকায় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য।

সকাল-সন্ধ্যা দলবেঁধে আড্ডা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার বিস্তার কমাতে নির্ধারিত এক মিটার সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা আবশ্যক। কিন্তু উঠতি বয়সের কিশোরদের তা বোঝাবে কে। বন্দরনগরীর অধিকাংশ গলিতে তাদের দলবেঁধে আড্ডারত অবস্থায় দেখা গেছে।

এসময় তাদের মুখে মাস্ক থাকলেও নির্ধারিত দূরত্ব মানছেন না কেউ। অভিভাবক কিংবা পাড়ার মুরুব্বি, কারও কথাই ঘরে আটকে রাখতে পারছে না তাদের।

রাস্তায় ক্রিকেট, জুয়ার আড্ডা

করোনার কারণে নগরীর অলি-গলিতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কমেছে যানবাহনের সংখ্যাও। আর এই সুযোগে গলিতে ক্রিকেট খেলতে ব্যাট-বল হাতে নেমে পড়েছে কিশোর বাহিনী। শুধু রাস্তাতেই নয়, পাড়ার শূন্য প্লটগুলোতেও ক্রিকেট খেলতে ব্যস্ত তারা।

শুধু ক্রিকেট নয়, নগরীর বিভিন্ন স্থানে তিন থেকে চারজন একত্রিত হয়ে খেলছে জুয়াও। এসময় রীতিমতো ভিড় জমিয়ে তাদের খেলা দেখতে দেখা গেছে বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষকে! ক্রিকেট কিংবা জুয়া, দুই ক্ষেত্রেই অনেকের মুখেই দেখা যায়নি সুরক্ষা উপকরণ। জুয়ার আড্ডায় ছিল না ন্যূনতম শারিরীক দূরত্ব।

প্রকাশ্যেই মাদক সেবন

নগরীর পশ্চিম বাকলিয়ার শান্তিনগর এলাকার বিভিন্নস্থানে মাদকসেবী কিশোরদের প্রকাশ্যেই গাঁজা সেবন করতে দেখা গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, এ এলাকায় মাদকের অবাধ বিক্রি ও সেবন দীর্ঘদিনের সমস্যা।

মাদকের টাকা জোগাড় করতে ছিনতাই, চুরিসহ নানা অপরাধে সম্পৃক্ত এলাকার কিশোর-তরুণরা। শুধু বাইরে নয়, মাদকের টাকা জোগাড় করতে পরিবারের সদস্যদেরকেও মারধর এখানে নিয়মিত ঘটনা। করোনা সংক্রমণের পরও এই সংস্কৃতিতে লাগাম পড়েনি। বরং এলাকায় এখনও চলছে প্রকাশ্যে মাদকসেবন।

তুচ্ছ ঘটনায় শক্তি প্রদর্শনের মহড়া

কিশোর গ্যাং কালচারের অপরিহার্য অংশ তুচ্ছ ঘটনায় শক্তি প্রদর্শনের মহড়া। আর্থিক লেনদেন নিয়ে বচসা, খেলা নিয়ে তর্ক কিংবা আধিপত্য বিস্তার, পরিণতিতে সংঘর্ষ কিশোর গ্যাংগুলোর জন্য স্বাভাবিক ঘটনা।

গত একমাসে করোনা নিয়ে চরম উদ্বেগের মাঝেও নগরীর পশ্চিম বাকলিয়ার শান্তিনগর এলাকায় একাধিকবার শক্তি প্রদর্শনের মহড়া হয়েছে। এসব ঘটনায় গ্যাংগুলোর সদস্যদের মধ্যে লাঠি ও ধারালো অস্ত্রসহ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। স্বাভাবিক সময়েও নগরীর অধিকাংশ এলাকায় স্থানীয় বড় ভাই বা রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ নিয়মিত ঘটনা বলা চলে। এসব ঘটনায় হতাহতের ঘটনাও কম নয়।

পুলিশ এলেই উধাও, চলে গেলেই জমজমাট

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, জনাসমাগম বন্ধ করতে চট্টগ্রামে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন সেনাবাহিনী-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তবে পুলিশি অভিযানের খবর পেলেই লুকিয়ে যান কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। আবার পুলিশ চলে গেলেই বেরিয়ে আসেন।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালে নগরীর গোসাইলডাঙা বড় বাড়ি এলাকায় অভিযানে যায় পুলিশ। এসময় কিছু সময়ের জন্য সরে পড়লেও পুলিশ চলে যাওয়ার পর আবার সড়কে ফেরে কিশোর বাহিনী। প্রশাসনের সদস্যরাও বিষয়টি স্বীকার করে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার ২২ নম্বর রোডের বাসিন্দা ইয়াসীন হীরা বলেন, ‘আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক, বেপারি পাড়া, মুহুরি পাড়াসহ এখানকার প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই কিশোর অপরাধীরা সমানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

করোনা সংক্রমণের এই ঝুঁকিপূর্ণ সময়েও তারা প্রতিদিন অলি-গলিতে দলবেঁধে আড্ডা দিচ্ছে। আবাসিক এলাকার কিছু ছেলে সঙ্গে থাকলেও এদের অধিকাংশই বস্তিতে বসবাস করে। তাদের মধ্যে কোনো শৃঙ্খলা নেই, পড়ালেখা বা কোনো কাজকর্ম করতেও তাদের দেখা যায় না।’

এসব কিশোররা সারা বছর ইভটিজিংসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখন স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় ইভটিজিংয়ের সুযোগ সেভাবে না পেলেও অলি-গলিতে তারা ঠিক দলবেঁধে অবস্থান করছে।

সাধারণ মানুষ ভীষণ বিরক্ত হলেও ভয়ে তাদের কিছু বলে না। পুলিশের গাড়ি দেখলে তারা অলি-গলিতে ঢুকে যায়। কেউ কেউ আশেপাশের বাড়ির আঙিনায় ঢুকে পড়ে।’

এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মাঝে-মধ্যে ভাড়ায় খাটে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এলাকার মধ্যে মারামারি, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে এসব কিশোররা জড়িত রয়েছে।

এরা মাদক আদান-প্রদানে একটা বড় সোর্সের ভূমিকা পালন করে। এলাকার জনপ্রতিনিধি ও বড় ভাইদের ছায়ায় তারা দীর্ঘদিন ধরে এসব অপরাধ করে আসছে।’

জানতে চাইলে ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সদীপ কুমার দাশ বলেন, ‘আমরা এলাকায় গেলে তারা দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। আবার আমরা চলে আসলে তারা আবার একত্রিত হয়। কী করা যায় বলেন।

আমরাতো আর তাদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করতে পারি না।’কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘দেশে গ্যাং-ই নেই, আবার কিশোর গ্যাং। করোনার পর থেকে তারা সবাই এখন নিরাপদ অবস্থানে চলে গেছে।

পশ্চিম বাকলিয়ার শান্তিনগর এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমার বাসার পেছনে একটি খালি তিনতলা ভবনে প্রতিদিন বখাটে কিশোরদের আড্ডা বসে। করোনা সংক্রমণের পরও তাদের সংখ্যা কমেনি। এখনও প্রতিদিন তারা এখানে দিনদুপুরে মাদকসেবন করে। আড্ডা দেয়। এখন পর্যন্ত এখানে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যের দেখা মেলেনি।’

তিনি বলেন, ‘শুধু ওই ভবনটিতেই নয়। শান্তিনগর ও বগারবিল এলাকার প্রায় সর্বত্র এখনও প্রকাশ্যেই চলছে মাদকসেবন। এখানকার রাস্তায় সুরক্ষা উপকরণ ছাড়াই ঘুরছেন অনেকে। বাজারে প্রতিদিন জমছে ভিড়।

সামাজিক দূরত্ব মানার ব্যাপারে কারও কোনো মাথাব্যথাই নেই!’অলি-গলিতে অবস্থানরত কিশোরদের ঘরে ফেরাতে ভূমিকা জানতে চাইলে বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ে আছি। এলাকায় সব ধরনের জনসমাগম বন্ধ করতে পুলিশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’

খুঁটির জোর লিডার, ‘বড় ভাই’

কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যের মানুষদের খোঁজে অনুসন্ধানে গেলে উঠে আসে উদ্বেগজনক কিছু তথ্য। মূলত রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় নানা অপকর্ম করে আসছে এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা। মাদক বিক্রি, চুরি, ছিনতাই, জমি দখল থেকে শুরু করে অনেক অপরাধেই হাত পাকানো হয়েছে তাদের। তাও কিশোর বয়সেই।

পুলিশ ধরলে লিডার বা ‘বড় ভাই’-এর পরিচয় দেয় তারা। আবার এলাকায় দাপট ধরে রাখতেও তারা ব্যবহার করে বড় ভাইয়ের সাইনবোর্ড। আর সেই বড় ভাইরা তাদের ব্যবহার করেন এলাকায় নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে।

এ নিয়ে গত এক বছরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপের কথা শোনা যায়নি। কিশোর অপরাধের চিহ্নিত নির্দেশদাতারা তাই এখনও প্রকাশ্যে ঘুরছেন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল গত ২৯ মার্চ। যদিও করোনার কারণে পিছিয়ে যায় সেই নির্বাচন। নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন কিশোর গ্যাংয়ের প্রশ্রয়দাতা হিসেবে পরিচিত একাধিক রাজনীতিক।

এসব প্রার্থী নির্বাচিত হলে কিশোর অপরাধ বেড়ে যেতে পারে বলে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এখনই কিশোর গ্যাংগুলোর লাগাম টেনে না ধরলে সামনের দিনগুলোতে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এজন্য কিশোর গ্যাংয়ের হোতাদের যত দ্রুত সম্ভব আইনের আওতায় নিয়ে আসা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।