করোনা প্রভাবে বান্দরবানের ৩৬ শিক্ষক পরিবারে চলছে নীরব দুর্ভীক্ষ!

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ

করোনাভাইরাসের কারণে সাধারণ ছুটির মধ্যে পরিবার নিয়ে দুরাবস্থায় পড়েছে বান্দরবন জেলার ৩৬ বেসরকারি শিক্ষক-শিক্ষিকা। অস্বচ্ছল পরিবারের এসব শিক্ষকদের আর্থিক কিংবা খাদ্য সহায়তায় কেউ এগিয়ে না আসায় চরম বিপাকে পড়েছেন। ফলে এসব শিক্ষক-শিক্ষিকারা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

জানা যায়, বান্দরবান পার্বত্য জেলার সদর উপজেলার ৫টি ও লামা উপজেলার ৪টি একত্রে ৯টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১৪ হাজারেরও অধিক শিশুদের পাঠশিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন ৩৬ শিক্ষক। মূলত এসব স্কুলগুলি বেসরকারি ভাবে পরিচালিত হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সঠিক ভাবে তাঁরা বেতন ভাতা ও পাচ্ছেন না। পাশাপাশি সরকারি বা বেসরকারি কোন সুযোগ সুবিধা না পাওয়ায় করোনা সংকটকালীন সময়ে খুবই মানবেতর জীবন যাপন করছে বলে খবর পাওয়া যায়।

ফলে মানুষ গড়ার কারিগর ৩৬ শিক্ষকরা এখন তাদের সংসারের ব্যয়ভার বহন করতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকে উপায় না দেখে টিউশনি, কৃষি কাজ, ভাড়ায় চালিত বাইক, মেয়েরা সেলাই কাজ, ছোট হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন মৌসুমী পেশায় জড়িয়ে কোন রকম সংসারের গ্লানি টানছেন। অপরদিকে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে বিপাকে রয়েছেন। শিক্ষিত মানুষ চক্ষু লজ্জার ভয়ে কাউকে বলতেও পারছে না আবার সইতেও।

জানতে চাইলে বান্দরবান সদরের মশাবনিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবদুল হাই জানান, আমি টিউশনি ও চাষাবাদ করে কোন রকম পরিবারের খরচ সামাল দিচ্ছি। আজ প্রায় এক মাস যাবত খেয়ে না খেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি। তিনি আরো জানান, কোভিড-১৯ মহামারি আকার ধারণ করায় আমরা একটা সংকটের মধ্যে রয়েছি। তবে সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে আমরা যারা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াই সেসব শিক্ষিকরা। এমনি ঠিকভাবে বেতন পাই না তার উপর করোনায় লকডাইন। আমাদের আর্থিক অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের পরিবারও দুরাবস্থার মধ্যে রয়েছে। কঠিন এই সময়ের কষ্ট লাঘবের জন্য আমরা ৩৬ শিক্ষক শিক্ষিকা মাননীয় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বান্দরবানের হেব্রন পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও লামার ধুইল্যাপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, ‘টিউশনি ও মোটর বাইক চালিয়ে কোন রকমে সংসার চলতো। এখন তাও বন্ধ হওয়ায় খুব কষ্ট হচ্ছে আমাদের। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষেরা যেন অামাদের কষ্টটা একটু বুঝার চেষ্টা করেন।’

বান্দরবান জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সহ-সভাপতি সৈয়দা শাহনাজ পারভীন জানান, ‘আমাদের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সরকারি কোন সুযোগ সুবিধা পাইনা। এই দুর্যোগ মুহুর্তে এখনো পর্যন্ত আমাদের শিক্ষকরা সরকারি বা বেসরকারি ভাবে কোন ধরনের সহযোগিতা না পাওয়ায় তাদের পরিবারে হাহাকার বিরাজ করছে। এমন অবস্থায় আমি মাননীয় পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রী মহোদয় ও বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মহোদয়ের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’

বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা বলেন, ‘জেলা পরিষদ দেখে মূলত সরকারি স্কুল গুলো তারপরেও আমাদের কাছে যেহেতু জানালেন আমি খবর নিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি। কোন শিক্ষক মানবেতর জীবন যাপন করবে তা জাতি কিংবা আমাদের জন্য দুঃখজনক।’

বান্দরবান সদর উপজেলার ইউএনও মোঃ হাসিবুল হাসান বলেন,‘স্কুলগুলো মূলত জেলা পরিষদ দেখে আমি আমার অবস্থান থেকে খোঁজখবর নিয়ে বেসরকারি স্কুল গুলোর শিক্ষকদের সাময়িক সমস্যা দূরী করণে চেষ্টা করব।’

লামা উপজেলার ইউএনও নূর-এ-জান্নাত রুমি বলেন, ‘আমাদের উপজেলায় যেসব বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে সেসব স্কুলের তালিকা আমার কাছে রয়েছে। আমরা প্রায় সময় তাদের সহযোগিতা করে থাকি। এখন যদি কোন শিক্ষক শিক্ষিকা মানবেতন জীবন যাপন করে অামি স্থানীয় চেয়ারম্যানদের বলে দিচ্ছি তাদের খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নিতে।’

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমাজের বিভিন্ন স্তরের খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করলেও বান্দরবনের অনেক পরিবারে এখনো তা পৌঁছেনি। জেলার অনেক ত্রাণ সহায়তাকারীদের ত্রাণও এখনো বান্দরবনের অানাচে কানাচে বিতরণ করতে দেখা যায়নি। ফলে মানবেতর জীবন যাপন করা এসব শিক্ষকরা পরিবার পরিজন নিয়ে খুব কষ্টে রয়েছেন।