মৌসুমী ফলের আড়তে ক্রেতাশূন্য

নগরের বৃহৎ দুটি ফলের পাইকারি বাজার কদমতলী বিআরটিসি মার্কেট ও ফিরিঙ্গীবাজারে আড়তে জমছে মৌসুমী ফল তরমুজ, বাঙ্গি, আনারস ও কলা। সাধারণত বছরের এ সময়টাতে ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁক-ডাকে এসব আড়ত জমজমাট থাকে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কমে গেছে ক্রেতার সংখ্যা। ফলে এখানকার শতাধিক পাইকারি আড়তে ব্যবসায় চলছে দুর্দিন। বিআরটিসি মার্কেটে আমদানি করা ফল বেশি বিক্রি হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনার প্রভাবে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং জটিলতা ও পরিবহন সংকটের কারণে বন্দর থেকে ফলের কন্টেইনারে ছাড়াতে দেরি হচ্ছে। এতে অনেক ফল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

সরবরাহজনিত সমস্যায় ইতোমধ্যে ভারত সহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত কমলা, মাল্টা, আপেল, আঙ্গুর ও আনারের সংকট দেখা দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এসব ফলের দাম বেড়ে যাওয়ায় চাহিদাও কমেছে।

পাইকারি ব্যাবসায়ীরা জানান, রমজান মাস উপলক্ষে বাড়তি চাহিদা ও সরবরাহ কমে আসায় দাম বেড়েছে সব ধরনের ফলের। ফলমণ্ডির পাইকারি বাজারে মানভেদে ২৪ কেজি ক্যারেটের কমলা বিক্রি হচ্ছে ২৬শ থেকে ২৮শ টাকা, ১৫ কেজির মাল্টার ক্যারেট বিক্রি হচ্ছে ১৫শ থেকে ১৬শ টাকা, ১৮ কেজির আপেলের ক্যারেট বিক্রি হচ্ছে ১৯শ থেকে ২২শ টাকা, আনার বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২শ থেকে আড়াইশ টাকা। এছাড়া আঙ্গুর প্রতিকেজি ২৫০ টাকা, পেয়ারা ৭০-৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

ফিরিঙ্গীবাজারের আড়তে দেশে উৎপাদিত সব ধরনের ফল পাইকারি বিক্রি হয়ে থাকে। আবহাওয়া ভালো থাকায় এবছর বিভিন্ন এলাকায় তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। পাশাপাশি বাঙ্গি, আনারস ও কলার ফলনও হয়েছে আশানুরূপ। এসব ফল আড়তে আনতে পরিবহন খরচ দিতে হয়েছে দ্বিগুণ। কিন্তু তেমন ক্রেতার দেখা পাননি আড়তদাররা। বৃষ্টি হওয়ায় তরমুজ ও বাঙ্গির চাহিদাও কমে গেছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, ১৯৫৪ সালের দিকে ব্রিজঘাটের রশীদ মার্কেটে সাত-আটটি আড়ত নিয়ে শুরু হয় ফলের ব্যবসা।এখন ফিরিঙ্গীবাজারে আড়ত আছে শতাধিক। একেকটি আড়তে প্রতিদিন ৮০-৯০ হাজার টাকার লেনদেন হয়। কখনো কখনো এর পরিমাণ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। এখানে কলা আসে মূলত খাগড়াছড়ি, রংপুর, মেহেরপুর, টাঙ্গাইল, নওগাঁ, মুন্সিগঞ্জ ও দিনাজপুরে থেকে, তরমুজ আসে আনোয়ারা, সীতাকুণ্ড, নোয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও টেকনাফ থেকে।

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে তিন পার্বত্য জেলা ও জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকেও ট্রাকভর্তি হয়ে আসে বেল, কাঁঠাল, লিচুসহ মৌসুমী ফল। বর্তমান আড়তগুলোতে মোটামুটি ফলের সরবরাহ থাকলেও পাইকারির তুলনায় খুচরাতে দাম একটু বেশি।

রাঙামাটির ফলচাষী মো. ফজলু বলেন, ক্ষেতের তরমুজ বিক্রি করতে চট্টগ্রামের অনেক ফল ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু তারা পরিবহন বন্ধ থাকায় রাঙামাটিতে আসতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন। এ অবস্থায় স্থানীয় বাজারে তরমুজ বিক্রি করতে হচ্ছে। দামও পাওয়া যাচ্ছে না।

ফিরিঙ্গীবাজারের আড়তে খাগড়াছড়ি থেকে কাঁঠাল সরবরাহ করতেন মো. ফরিদ। তিনি জানান, সাধারণত রাঙামাটি, বান্দরবান এবং কাপ্তাই থেকে চট্টগ্রামে কাঁঠাল যায়। এখন পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় কাঁঠাল পাঠিয়ে লোকসান গুণতে হবে। বাগান থেকে একশ কাঁঠাল চার-পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হতো।

এখন তিন-চারশ টাকায় বিক্রি করাই দায় হয়ে গেছে। ফলের আড়তদার মো. মন্টু জানান, নগরীতে প্রতিদিন দুই-তিন লাখ টাকার কলা বিক্রি হতো। কিন্তু এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ হাজার টাকার কলা। পার্বত্য এলাকা থেকে বাংলা কলা ও চিনি চাম্পা কলা আসে। টাঙ্গাইল, নওগাঁ, দিনাজপুর, মুন্সিগঞ্জ থেকে আসে মানিক, অনুপম, মেহের সাগর কলা। ক্রেতা না থাকায় কলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আড়তে।

পাইকারী ক্রেতারা জানান, মাঝারি আকারের তরমুজ ৫০-১০০ টাকা, বড় তরমুজ ১০০-২০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আনারস প্রতি জোড়া ৩০-৪০ টাকা, বেল প্রতিটি ২০-৩০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

চট্টগ্রাম ফল আড়ত মালিক সমিতির সহ-সভাপতি লায়ন দুলাল চন্দ্র দে বলেন, ব্যবসা এখন খুবই মন্দা। পচনশীল হওয়ায় দ্রুত বিক্রি করা না গেলে তরমুজ, আনারস, কলা নষ্ট হয়ে যায়। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এসব ফলের দামও একটু বেশি। কিন্তু পাইকারদের কাছ থেকে দাম পাওয়া যাচ্ছে না, আবার বিক্রি না করেও উপায় নেই।