মর্নিংসান২৪ডটকম Date:১১-০১-২০১৫ Time:৬:৪৪ অপরাহ্ণ


SAM_0213মোহাম্মদ আলী বান্দরবান প্রতিনিধি: বান্দরবানসহ তিন পার্বত্য জেলায় একটি নতুন ভাষা রেংমিটচা ভাষার পুরঃরাবিস্কার এর উপর একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালাটি রবিবার সকাল ১১:টায় বান্দরবান প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় রেংমিটচা ভাষা সংরক্ষনের উপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমুথ কলেজের প্রোগ্রাম ইন লিঙ্গুইস্টিক্স এন্ড কগনিটিভ সায়েন্স অধ্যাপক ডক্টর ডেভিড এ. পিটারসন। তাঁর সাথে সহযোগিতায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নায়রা খান, বান্দরবান মধ্যম পাড়ার কোথোয়াইন এনজিও এর উপ-সহকারী পরিচালক আজহারুল ইসলাম বাবুল, বান্দরবান মধ্যম পাড়ার কোথোয়াইন এনজিও এর সহকারী পরিচালক গাবরিল ত্রিপুরা। ডক্টর ডেভিড এ.পিটারসন তাঁর উপস্থাপনায় জানান,পঞ্চাশের দশকে লোরেনজ লোফলার নামক এক নৃবিজ্ঞানী দক্ষিন পার্বত্য চট্টগ্রামের তৈনু নদীর তীরে বসবাসরত জাতিসত্ত্বার মধ্যে একটি স্বতন্ত্র দলের পরিচয় পান। এই দলটির নাম ছিল ‘রেংমিটচা’। যদিও তাঁদের সাংস্কৃতিক রীতিনীতি মত ছিল এবং তাঁরা নিজেদের । হিসেবে পরিচয় দিতো। তাঁদের ভাষা ছিল ভিন্ন। লোফলার তখন রেংমিটচাকে ¤ ভাষা হতে একটি সম্পূর্ণ পৃথক ভাষা হিসেবে বিবেচনা করেন। ১৯৬০ সালে তিনি রেংমিটচা ভাষার উপর জার্মান ভাষায় একটি জার্নাল নিবন্ধ প্রকাশ করেন। আশির দশকে তিনি ক্লাউস-ডিটার ব্রাউন এর সাথে ¤্রাে ভাষার উপর একটি প্রখ্যাত বই রচনা করেন। তবে এবার তিনি রেংমিটচার অবস্থা নিয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়েন। রেংমিটচা ভাষীর সংখ্যা আরো কমে গিয়েছিল। বর্তমান কাজটির গবেষক হিসেবে আমি ডেভিড এ. পিটারসন ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তার ভাষা নিয়ে কাজ শুরু করি। তখনো এই ভাষা সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ ১০ বছর পরে ২০০৯ সালে যখন এক ¤্রাে ভাষী আমাকে বল্লেন যে, এক ভিন্ন ধরনের ¤্রাে ভাষা আছে যা রেংমিটচা নামে পরিচিত এবং তাঁরা বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলায় বসবাস করেন। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, রেংমিটচা ভাষী এখনো জীবিত আছেন। আমি সাথে সাথে আলীকদমে গেলাম তাঁদের সন্ধানে। ২০০৯ সালে আমার প্রচেষ্টা সফল হয় এবং আমি তিন (৩) জন রেংমিটচা ভাষী খুঁজে পাই। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে আমি আরো দুই (২) জন রেংমিটচা ভাষীর খোঁজ পাই। আরো কয়েকজন সম্ভাব্য ভাষীদের নিয়ে আমি একটি তালিকা তৈরী করি, যার সংখ্যা ৩০ জন। বর্তমানে বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোর মধ্যে রেংমিটচা ভাষার অবস্থা খুবই নাজুক। জীবিত ভাষীদের মধ্যে প্রায় সবারই বয়স ৫০ এর উর্ধ্বে এবং এঁদের বেশির ভাগের বয়স প্রায় ৭০ বছরের কাছাকাছি। ভাষাটি তাঁদের বংশধরদের প্রায় দুই অথবা তিন প্রজন্ম ধরে শেখানো হয়নি। বর্তমানে যে ভাষীরা রয়েছেন তাঁরা এখন আর রেংমিটচা ভাষায় কথা বলেননা। যদিও এক সময় তাঁরা শুধুমাত্র ঐ ভাষায় কথা বলতেন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেসনের ‘ডকুমেন্টিং এন্ডেন্জার্ড লেঙ্গুয়েজেস প্রোগ্রাম’ রেংমিটচা ভাষার সংরক্ষণকে সর্বোপরি গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের সহায়তায় আমি ২০১৫ সালের ৩ জানুয়ারীতে বান্দরবান জেলার আলীকদমে আসি এবং পূর্বের তালিকা অনুযায়ী সম্ভাব্য ভাষীদের খুঁজে বের করার জন্য কাজ শুরু করি। এই গবেষণা কাজটির স্বার্থে আমি চলতি সপ্তাহে বান্দরবানে একটি কর্মশালার আয়োজন করেছি এবং এতে দশ (১০) জন রেংমিটচা ভাষী অংশগ্রহণ করেন। যাঁরা বান্দরবনের কর্মশালাটিতে অংশগ্রহণ করতে পারেননি তাঁদের নিয়ে পরবর্তীতে আলীকদমে একই ধরনের আরো একটি কর্মশালার আয়োজন করা হবে। কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য হলো রেংমিটচা ভাষার বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা, জাতি সত্ত্বাটিকে এই প্রকল্পে জড়িত করা, সমাজকে এ ভাষার পরিস্থিতি এবং এই ভাষাকে পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন করা। বর্তমানে এই প্রকল্পটি গবেষণামূলকভাবে আরো কয়েক বছর চলমান থাকবে। এর উদ্দেশ্য হলো রেংমিটচা ভাষা সংরক্ষণ করা, যেন এই ভাষা সম্পর্কিত তথ্য সকলের জন্যে সংরক্ষিত হয়। যে ভাষীরা জীবিত রয়েছেন এবং ঐ জাতিসত্ত্বার যারা এই ভাষার ঐতিহ্য পুনরায় ফিরে পেতে চান, তাঁদের জন্য রেংমিটচা ভাষা পুনরুজ্জীবিত করার বাস্তব পরিকল্পনা তৈরী করা হবে।