আজ সরস্বতী পূজা

indexতপন কুমার দাশ, চট্টগ্রাম অফিস: হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শ্রী শ্রী সরস্বতী পূজা আজ। প্রতিবছরের মতো জ্ঞানের আলো ছড়াতে আবারও এসেছেন বিদ্যার দেবী সরস্বতী। অগণিত ভক্ত আজকের পঞ্চমী তিথিতে বিদ্যা ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর চরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবেন। অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করতে কল্যাণময়ী দেবীর পাদপদ্মে প্রণতি জানাবেন তারা। “সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে/বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যংদেহী নমোহস্তুতে” -এ মন্ত্র উচ্চারণ করে বিদ্যা ও জ্ঞান অর্জনের জন্য দেবী সরস্বতীর অর্চনা করবেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বাণীতে সরস্বতী পূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়কে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।
এর আগে সোমবার রাতেই সারাদেশের বিভিন্ন মণ্ডপে দেবীর প্রতিমা স্থাপনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছেন পূজারিরা। মঙ্গলবার পূজা শেষে প্রসাদ বিতরণ করা হবে। সন্ধ্যায় আরতি ছাড়াও রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন। পূজা উপলক্ষে রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নানা অনুষ্ঠান হাতে নিয়েছে। ঢাকাসহ সারাদেশের মন্দির ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পূজা ছাড়াও অন্য অনুষ্ঠানমালায় আছে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ বিতরণ, ধর্মীয় আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সন্ধ্যা আরতি, আলোকসজ্জা প্রভৃতি। পূজা উপলক্ষে সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বিদ্যা ও সংগীতের দেবী সরস্বতীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠেয় একটি অন্যতম প্রধান হিন্দু উৎসব সরস্বতী পূজা। বাণী, বীণাপাণি, সারদা, ভারতী, বাগ্দেবী, মহাশ্বেতা প্রভৃতি বিভিন্ন নামে ডাকা হয় বিদ্যা ও কলার দেবী সরস্বতীকে। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে এ দেবীর পূজা আয়োজিত হয়। তিথিটি শ্রী পঞ্চমী বা বসন্ত পঞ্চমী নামেও পরিচিত। শ্রী পঞ্চমীর দিন ভোরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছাত্রছাত্রীদের গৃহ ও সর্বজনীন পূজামণ্ডপে দেবীর পূজা হয়। ধর্মপ্রাণ হিন্দু পরিবারে এ দিন শিশুদের হাতেখড়ি, ব্রাহ্মণভোজন ও পিতৃতর্পণের প্রথাও প্রচলিত আছে। পূজার পরের দিনটি শীতলষষ্ঠী নামে পরিচিত। সরস্বতী বৈদিক দেবী হলেও সরস্বতী পূজার বর্তমান রূপটি আধুনিককালে প্রচলিত হয়েছে। তবে প্রাচীনকালে তান্ত্রিক সাধকেরা সরস্বতী-সদৃশ দেবী বাগেশ্বরীর পূজা করতেন। আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজার প্রচলন হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রী পঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন করা যায়। এ পূজায় আমের মুকুল, দোয়াত-কলম, যবের শিষ, বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুলসহ কয়েকটি বিশেষ সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। লোকাচার অনুসারে, ছাত্রছাত্রীরা পূজার আগে উপবাস করেন। পূজার দিন কিছু লেখাও নিষিদ্ধ আছে। যথাবিহিত পূজার পর লক্ষ্মী-নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার (দোয়াত-কলম), পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পূজা করার প্রথ্রী প্রচলিত আছে। পূজান্তে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার প্রথাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের দল বেঁধে অঞ্জলি দিতে দেখা যায়।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনের কেন্দ্রীয় পূজামণ্ডপে সরস্বতী পূজার আয়োজন করেছে। এখানে সকাল ৬টায় প্রতিমা স্থাপন, ৯টায় পূজা, ১০টায় পুষ্পাঞ্জলি প্রদান, দুপুর ১২টায় প্রসাদ বিতরণ, সন্ধ্যা ৭টায় সন্ধ্যা আরতি এবং রাতে আলোকসজ্জা করা হবে।
রাজধানীতে সরস্বতী পূজার মূল আকর্ষণ হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল। এখানে নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন প্রতিমা। জগন্নাথ হলে কেন্দ্রীয় পূজামণ্ডপ ছাড়াও এবার ৫৭টি বিভাগ মিলিয়ে মোট ৬০টি পূজামণ্ডপ স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে হল কর্মচারীদের দুটি পূজামণ্ডপ রয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫টি বিভাগের উদ্যোগে স্থাপন করা হয়েছে পৃথক ২৫টি পূজামণ্ডপ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল, বেগম শামসুন্নাহার হল, কুয়েত মৈত্রী হল এবং বেগম ফজিলাতুন্নেছা হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, তেজগাঁও কলেজ, পোগোজ স্কুল, কলেজিয়েট স্কুল, তিতুমীর কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সচিবালয়, জজকোর্ট প্রাঙ্গণে ঢাকা আইনজীবী সমিতি, মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দির, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি (বাফা), শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজার এলাকায় সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এছাড়া রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ, রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম, ইস্কন মন্দির, রামসীতা মন্দির, প্রভু জগদ্বন্ধু মহাপ্রকাশ মঠ প্রাঙ্গণে ব্যাংকার্স পূজা পরিষদের উদ্যোগে সরস্বতী দেবীর বাণী অর্চনার আয়োজন করা হয়েছে।এদিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদযাপন করা হচ্ছে সরস্বতী পূজা। এ উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান পূজার অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। অন্যদিকে ঢাকা অফিসার্স ক্লাব ও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির সিদ্বেশ্বরী ক্যাম্পাসে সরস্বতী পূজার আয়োজন করা হয়েছে। পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শ্রী কানুতোষ মজুমদার ও সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ এবং মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি বাসুদেব ধর ও সাধারণ সম্পাদক নির্মল কুমার চ্যাটার্জি দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।প্রধানমন্ত্রীর বাণীসরস্বতী পূজা উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আবহমানকাল ধরে এদেশের সকল মানুষ মিলেমিশে বসবাস করে আসছেন। তারা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালন করছেন। আমি বিশ্বাস করি পারস্পরিক এ সম্প্রীতি সামনের দিনগুলোতে আরও সুদৃঢ় হবে।”প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সত্য, ন্যায় ও জ্ঞানালোকের প্রতীক দেবী সরস্বতী। বিদ্যা, বাণী ও সুরের অধিষ্ঠাত্রী। তিনি দেবী সরস্বতীর পূজা-অর্চনা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের সকলকে জ্ঞানার্জনে ব্রতী হয়ে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগের আহ্বান জানাই।”সরস্বতী পূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী।