মর্নিংসান২৪ডটকম Date:১২-০৫-২০১৫ Time:৮:৩৬ অপরাহ্ণ


108931_1সিলেট প্রতিবেদক: ব্লগার অভিজিৎ হত্যার স্টাইলে আরেক ব্লগার খুন হলেন । সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার উদ্দেশ্য নগরীর বনকলাপাড়া এলাকার বাসা থেকে বের হয়ে রিকশায় সুবিদবাজার এলাকায় পৌঁছলে চারজন মুখোশধারী দুর্বৃত্ত বিজয় দাশের ওপর চাপাতি দিয়ে হামলা করে । এসময় চাপাতির আঘাতে রক্তাক্ত শরীরে দৌঁড়াচ্ছেন তিনি। পেছনে মানুষ রূপী হায়েনাদের চাপাতির আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে তার দেহ।

জীবন বাঁচাতে এভাবে দৌঁড়ালেন প্রায় অর্ধকিলোমিটার। তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি। হায়েনাদের চাপাতির আঘাতে লুটিয়ে পড়লেন রাস্তায়। এরপরও ক্ষান্ত হয়নি তারা। মৃত্যু নিশ্চিত করতে শেষ বারের মতো শরীরে বসায় আরও চারটি চাপাতির কোপ। আর উঠে দাঁড়াতে পারলেন না তিনি।মুক্তমনা লেখক ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ হত্যাকাণ্ডের এমন রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাকে যখন কোপানো হচ্ছিলো, তখন প্রতিটি কোপ হাত দিয়ে ফেরানোর চেষ্টা করছিলেন। তবে তাদের হিংস্রতার কাছে মাথানত ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে চার মুখোশধারী সন্ত্রাসী এভাবে কুপিয়ে খুন করে মুক্তমনা লেখক (ব্লগার) অনন্ত বিজয় দাশকে (৩২)। তিনি নগরীর সুবিদবাজার বনকলাপাড়ার নূরানী ১৩/১২ বাসার রবীন্দ্র কুমার দাশের ছেলে ও সুনামগঞ্জের জাউয়া পূবালী ব্যাংক শাখার উন্নয়ন কর্মকর্তা।সরেজমিন দেখা যায়, রাস্তায় রক্তের ছোপ। চারদিকে মানুষের জটলা। ঘটনাস্থলটিকে আলাদা করে রেখেছে পুলিশ। বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে খুনের আলামাত সংগ্রহ করে পরিদর্শক শামীমুর রহমানের নেতৃত্বে সিআইডির একটি টিম।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, সকাল পৌনে ৯টায় মাঝারি অবয়বের মুখোশধারী চার যুবক সুবিদবাজার বনকলা পাড়া সড়কের মোড় থেকে দৌড়াচ্ছিলেন অনন্ত বিজয় দাশের পিছনে।কোপাতে কোপাতে তাকে নিয়ে আসা হয় বনকলাপাড়া দিঘীর দক্ষিণ পাড়ে। এখানেই রাস্তার ওপর লুটিয়ে পড়েন তিনি। ঘটানাটি খুব কাছে থেকে দেখেছেন স্থানীয় চা দোকানি আব্দুস সোবহান।আব্দুস সোবহান বলেন, বয়সে তারা চারজনই যুবক। মুখে মুখোশ পরা। এ অবস্থায় অনন্ত বিজয় দাশকে কোপাতে কোপাতে নিয়ে আসে তার দোকানের পাশে । আসামাত্র লুটিয়ে পড়েন অনন্ত। এরপর হাতে থাকা চাপাতি দিয়ে আরো চার কোপ দিয়ে ফেলে রেখে যায়।

সোবহান আরও বলেন, ঘটনাটি দেখে শরীর শিরশির করছিল। এসময় উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে ঘাতকরা বলে, নড়াচড়া করলে তোকে জবাই করে রেখে যাবো। ততক্ষণে তাজা প্রাণটি নিথর হয়ে গেছে।স্থানীয় এক বাসার বাসিন্দা সেলিনা বেগম বলেন, ঘটনাটি বাসার বারান্দা থেকে দেখেছেন তার খালা। এঘটনা দেখার পর তিনি অসুস্থ হয়ে গেছেন।

এদিকে খুনের ঘটনায় নিহতের পরিবারই নয়, এলাকা জুড়ে চলছে শোকের মাতম। এক অনন্তের জন্য কাঁদছে এলাকার ছেলে-বুড়ো সকলে।

নিহতের বোন পূরবী রানী দাশ এর পরিবার সূত্র জানায়, দুই ভাই, দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট অনন্ত বিজয় দাশ। সকালে মিনিট দশেক আগে নাস্তা সেরে বাসা থেকে ব্যাংকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় অনন্ত। এরপর খবর পাই তাকে হত্যা করা হয়েছে।এসময় বাসা থেকে কিছু আলামত জব্ধ করে পুলিশ। আলামত হিসেবে নিহতের ব্যাংকের পরিচয়পত্র, ‘মুক্তমনা’ লেখক হিসেবে প্রসংসাপত্র ও সঙ্গে কিছু বিজ্ঞান বিষয়ক বই। বাসার বুক সেলফে রাখা সারি সারি বইয়ের বেশির ভাগই বিজ্ঞান বিষয়ক।

নিহতের বোন পূরবী রানী বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারিসহ বিভিন্ন দিবসে অনন্ত লেখালেখি করতো। এ নিয়ে পরিবার থেকে বাধা দিয়েও তাকে দমানো যায়নি। লেখালেখিতে সে অবিচল ছিল। তবে, তার লেখার মধ্যে আমরা খারাপ কিছু খুঁজে পাইনি।

সিলেট গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক দেবাশীষ দেবু বলেন, অনন্ত গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক ও মুক্তমনা লেখক ছিলেন। পাশাপাশি বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল যুক্তি’র সম্পাদক ছিলেন। অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ন্যায় তাকেও কুপিয়ে খুন করা হয়েছে।

সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ রিপনকে কুপিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেছে কথিত আল-কায়েদা সমর্থক সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাটিম । মঙ্গলবার সকালের ওই ঘটনায় দুপুরে একাধিক টুইট বার্তায় আনসার বাংলা-৮ নামের এক আইডি থেকে এই হামলার দায় স্বীকার করা হয়।সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (মিডিয়া) সাংবাদিকদের বলেন, অনন্ত বিজয় দাশ একজন মুক্তমনা বিজ্ঞান সম্মত লেখক ও একটি ব্যাংকের উন্নয়ন কর্মকতা ছিলেন। তাকে খুনের ঘটনায় জড়িতদের বিষয়ে তিনি বলেন, খুনিদের সকলের বয়স ত্রিশের মধ্যে হবে। খুনিদের গ্রেফতারে ও মামলার তদন্তে ইতোমধ্যে পুলিশ মাঠে নেমেছে বলে জানান তিনি।

ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ হত্যার প্রতিবাদে আগামীকাল বুধবার সিলেটে আধাবেলা হরতাল ডাকা হয়েছে।