অবৈধ দখলদারদের কবলে কর্ণফুলী নদী

1429369010_p-1এ.এইচ.এম. সুমন চৌধুরী চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের প্রাণস্পন্দন কর্ণফুলী। কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে এ নদী। নদীর দু’তীরে চলছে জবর দখলের মহোৎসব। অবৈধ দখলের কাজটি চলছে দীর্ঘদিন থেকে। বিভিন্ন কোম্পানি, ডক ইয়ার্ড, ফিশারিজ শিপ ইয়ার্ড, কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে নদী দখলের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠান বন্দর প্রশাসনকে প্রভাবিত করে কাগজে-কলমে স্বল্প পরিসরে জেটি বা অন্য কোন স্থাপনার অনুমোদন নিয়ে পরবর্তীতে তা স্টিলের বা লোহার জেটিতে রূপান্তর করা হয়েছে। বন্দর অধ্যাদেশে পূর্বানুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ হলেও তা মানা হচ্ছে না। কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে বাংলাবাজার পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার এলাকায় ৬শ’র বেশি অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এগুলোর মধ্যে নদীর সীমানায় ৪শ’র মত। এছাড়া মাঝিরঘাট থেকে সদরঘাট এলাকায় রয়েছে ২৫০টির মতো অবৈধ ঘাট। নদী ও নদীর তীর দখল তৎপরতা অত্যন্ত ভয়াবহ। দখলদাররা পাকা, সেমিপাকা, কাঁচা কাঠামো নির্মাণ করে নদী ভরাট করছে। নগরীর বাকলিয়া, চাক্তাই ও রাজাখালী এলাকায় কর্ণফুলীর পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে বিশাল বস্তি। শত কোটি টাকার সরকারি খাসজমি দখল করে এসব এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে ১০ সহস্রাধিক বস্তিঘর। সরকারি দলের নাম ভাঙ্গিয়ে তা দখল করে জমিদারী প্রথায় ভাড়া দিয়ে আসছেন প্রভাবশালীরা। বস্তিঘর ভেদে ভাড়া পড়ে এক থেকে তিন হাজার টাকা। প্রতিমাসে ভাড়া ওঠে ৩০ লাখ টাকা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, প্রায় পাঁচ বছর আগে থেকে কর্ণফুলী নদীর পাড় ঘেঁষে অবৈধ বসতি গড়ে উঠতে শুরু করে। কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং শুরু হওয়ার পর থেকে রাতারাতি বদলে যায় নদী তীরের চেহারা। বাকলিয়া, চাক্তাই ও রাজাখালী এলাকায় গড়ে উঠতে থাকে শত শত বস্তিঘর। বাকলিয়া অংশে জসিম উদ্দিন ও চাক্তাই-রাজাখালী এলাকায় আকতার পৃথকভাবে এ দুইটি বস্তি নিয়ন্ত্রণ করে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এক তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, কর্ণফুলী তীরে মোট ১৫৮ দশমিক ৪৫ একর ভূমিতে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এদিকে শিল্প কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে কর্ণফুলী নদী। কর্ণফুলীর পাড় ও আশেপাশে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতি এবং শিল্প কারখানার বর্জ্য নদীতে পড়ায় কর্ণফুলীর পানি মারাত্মক দূষিত হয়ে পড়ছে। শিল্পবর্জ্যে পানি দূষণের কারণে এ নদীর পরিবেশও বিপন্ন হওয়ার পথে। দূষণের পাশাপাশি একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকারও এ নদী। এছাড়া কর্ণফুলীর শাখা নদী খালে স্লুইচ গেইট নির্মাণে নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে। ১৯৫৩ সালে তৎকালীন পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (পিআইডিসি) উন্নতমানের কাগজ উৎপাদনের জন্য নদীর তীরে কর্ণফুলী পেপার মিল প্রতিষ্ঠা করে। নিষ্কাশন ও পরিশোধনের কোন সুব্যবস্থা না থাকায় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ মিলের বর্জ্য পদার্থ নদীতে ফেলা শুরু হয়। এর ফলে কর্ণফুলী নদীর পানি দূষিত হতে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্রাতিরিক্ত দূষণের ফলে কর্ণফুলী থেকে দ্রুত মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীর মাছের উৎসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাছের প্রজনন কমে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের মোহনায়। ফলে সাগরে মাছের মজুদের পরিমাণও দিনদিন হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হলে কর্ণফুলী নদীর মাছের ভা-ার ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। ওই সময়ে নদীর দু’পাড়ে জনবসতি তেমন একটা গড়ে না ওঠায় কর্ণফুলীর পানি দূষণ নিয়ে কেউ ভাবেনি। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে কর্ণফুলী নদীর পাড় ও আশেপাশে গড়ে ওঠে অসংখ্য বসতি এবং শিল্প কারখানা। এসব শিল্পের বর্জ্য নদীতে পড়া শুরু হলে দূষণের বিরুদ্ধে সজাগ হয়ে ওঠে পরিবেশবাদিসহ সচেতন মানুষ। বিগত এক যুগ আগেও কর্ণফুলী নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। নদীতে জাল ফেললে মাছে ভরে যেত। কিন্তু এখন সেইদিন আর নেই। দূষণ ও কারেন্ট জাল ব্যবহারের কারণে নদীতে বর্তমানে মাছ নেই বললে চলে। জেলে সম্প্রদায় তাদের বাপ-দাদার বংশপরম্পরায় কর্ণফুলী নদীতে মাছ মেরে জীবিকা নির্বাহ করত। কাপ্তাই বাঁধের আগে নদীতে নানা মাছে ভরপুর ছিল। এমনকি নদীর শাখা খালবিলও মাছে ভর্তি ছিল। সেখান থেকে সারা বছরই মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু নদীতে কারেন্ট জাল ও দূষণের কারণে মাছ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। এতে সারাদিন জাল ফেললেও তেমন মাছ মেলে না। হতাশায় জেলেরা কূলে ফিরে। মাছ না পাওয়ায় তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে আর্থিক অনটনে রয়েছেন। অনেক জেলে ইতোমধ্যে পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। মৎস্য বিশেষজ্ঞের মতে, এক সময় কর্ণফুলী নদীতে প্রায় ১৪০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এর মধ্যে মিঠা পানির ৬০, মিশ্র পানির ৫৯ এবং সামুদ্রিক ১৫ প্রজাতির। কিন্তু দূষণের কারণে ইতোমধ্যে মিঠা পানির মাছ বিলুপ্ত প্রায়। অবশিষ্ট মাছের মধ্যে ১০ থেকে ২০ প্রজাতি ছাড়া অন্য প্রজাতির মাছ এখন পাওয়া যায় না। মূলত শিল্প কারখানার বর্জ্যে মারাত্মক দূষণের কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে কর্ণফুলী নদী। নাব্যতা হ্রাস এবং নদীর শাখা খাল ও কাপ্তাই লেকের স্লুইচ গেইটের পানি প্রবাহে বাধা পেয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে গেছে। এক সময়ের বিশাল মৎস্য ভা-ারে এখন সহজে মাছ মিলে না। এতে যেন দুঃখ নেমে এসেছে জেলে সম্প্রদায়ের মধ্যে। কর্ণফুলী নদীর চান্দগাঁও মোহরা, রাউজানের কচুখাইন, চৌধুরীহাট, উহলং, লাম্বুরহাট, কাটাখালী, রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী বড়–য়াপাড়া, সরফভাটা, চন্দ্রঘোনা, বোয়ালখালীর খেলারঘাট, ফকিরাখালী, নোয়ারাস্তা, গুইদ্দ্যাখালী, কধুরখীল, কৈবর্তপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩০টি জেলে পাড়া রয়েছে। এসব জেলে পাড়ায় প্রায় ১০ হাজার জেলে রয়েছে। তাদের প্রধান পেশা নদী থেকে মৎস্য আহরণ। কিন্তু নদীতে মাছ কমে যাওয়ার কারণে তাদের পেশা হুমকির মধ্যে পড়েছে। ইতোমধ্যে অর্ধেকেরও বেশি জেলে তাদের পেশা বদল করে অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়েছেন। মৎস্য গবেষকদের মতে, বর্তমানে নদীর প্রায় ৩০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। মূলত মাত্রাতিরিক্ত দূষণের কারণেই মাছ দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দূষণের কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নগর পরিবেশের ওপর, অন্যদিকে জীবিকা সংকটে পড়ছে এ অঞ্চলের হাজার হাজার জেলে।