এ কে খান পাহাড়ে জেলা প্রশাসনের অভিযানে ৪০ বসতঘর উচ্ছেদ

ctg_hill_eviction__5__954162483এ.এইচ.এম.সুমন, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের সরকারি-বেসরকারি পাহাড়গুলোতে প্রভাবশালীদের সহায়তায় নিম্ন আয়ের লোকজন অবৈধভাবে বসতি গড়ে তোলে। প্রতি বছরই চট্টগ্রামে পাহাড় ও মাটি ধসে বিভিন্ন এলাকায় লোকজন মারা যায়।

বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ও দেওয়াল ধসে গত ৮ বছরে প্রায় ২০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জুন স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড় ধসে চট্টগ্রামে ১২৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট লালখানবাজারের মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড় ধসে মারা যান ১১ জন, ২০০৯ ও ২০১০ সালে নগরীর পাহাড়তলী, সিআরবি, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে মারা যান আরও ১৫ জন।

২০১১ সালের ১ জুলাই পাহাড় ধসে একই পরিবারের ৮ জনসহ বাটালি পাহাড়ের রিটেইনিং দেয়াল ধসে ১৭ জন মারা যান। ২০১২ সালে ১৭ জুন নগরীর ফিরোজ শাহ কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকায় ২৩ জন মারা গেছেন। ২০১৩ সালে পাহাড় ও দেয়াল ধসে মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ৫ জনের।

২০০৭ সালে পাহাড় ধসের ঘটনার পর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে একটি কমিটি ২৮টি কারণ নির্ধারণ করে ৩৬টি সুপারিশ প্রণয়ন করে। তবে সুপারিশগুলো আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

শুধু বর্ষা মৌসুম আসলে তড়িঘড়ি করে কিছু বসতি উচ্ছেদ করে প্রশাসন।তারপর সারা বছর কোন খবর থাকে না প্রশাসনের।

আর বর্ষায় পাহাড় ধ্বসে প্রাণহানি ঠেকাতে নগরীর টাইগারপাস এলাকায় এ কে খান পাহাড় থেকে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে দশটা থেকে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ করেছে প্রশাসন।

দ্বিতীয়দিনের এই উচ্ছেদ অভিযান দুপুর দেড়টা পর্যন্ত চলে মোট ৪০টি বসতঘর উচ্ছেদ করেছে প্রশাসন।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকায় গিয়ে মাইকে অবৈধ ঘরগুলোর বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর শ্রমিকরা অবৈধ ঘরগুলো ভাঙতে শুরু করে। উচ্ছেদের সময় বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।

সদর সার্কেলের সহকারী কমিশনার(ভূমি) সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযানে আগ্রাবাদ সার্কেলের সহকারী কমিশনার(ভূমি) আবু হাসান সিদ্দিক, চান্দগাঁও সার্কেলের সহকারী কমিশনার(ভূমি) মোহাম্মদ আফজাল হোসেন, ওয়াসার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো.শামসুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া উচ্ছেদ অভিযানে পুলিশ, ভূমি কর্মকর্তা, সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, ফায়ার সার্ভিস, গ্যাস, বিদ্যু‍ৎ বিভাগের কর্মকর্তারা অংশ নেন।

দুপুর একটার দিকে এ কে খান পাহাড় পরিদর্শন করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(রাজস্ব) ও পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব মো.ইলিয়াছ হোসেন।

জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন,‘পাহাড়ের পাদদেশে এবং ঢালুতে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরে যাওয়ার জন্য প্রশাসন নোটিশ ও মাইকিং করা হয়েছিল। কিছু পরিবার সরে গেলেও অনেকে তাদের বসতি সরিয়ে নেয়নি। তাই প্রাণহানি বন্ধে প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে।

পুরো রমজান মাস পর‌্যন্ত উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

উচ্ছেদ অভিযান শেষে সদর সার্কেলের সহকারী কমিশনার(ভূমি) সাইফুল ইসলাম বলেন, নগরীর ১১টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ৬৬৬টি পরিবারের বসতি রয়েছে।

তিনি বলেন, বসতি উচ্ছেদের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। এছাড়া যারা অবৈধভাবে কলোনী তৈরী করেছিল তাদেরকে সর্তক করা হয়েছে এবং পাহাড়গুলো তদারকির জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত ১৪ জুন মতিঝর্ণা এলাকা থেকে ১৮টি ঝুঁকিপূর্ণ বসতঘর উচ্ছেদ করা হয়।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, নগরীর ১১টি পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ৬৬৬টি পরিবার বসবাস করছে। এর মধ্যে নগরীর একে খান মালিকানাধীন পাহাড়ে ১৮৬ পরিবার, ইস্পাহানি পাহাড়ের দক্ষিণ পাশে হারুন খানের পাহাড় ও বায়তুল আমান সোসাইটির কাছে পাহাড়ে ৫টি, কৈবল্যধাম বিশ্ব কলোনি পাহাড়ে (পানির ট্যাংক) ২৭টি, লেকসিটি আবাসিক এলাকার পাহাড়ে ১২টি, আকবর শাহ আবাসিক এলাকা পাহাড়ে ২২টি, পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে সিটি কর্পোরেশন পাহাড়ে ১১টি, ফয়েজ লেক আবাসিক এলাকার কাছে পাহাড়ে ৯টি, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট অ্যাকাডেমির উত্তর পাশে মীর মোহাম্মদ হাসানের মালিকানাধীন পাহাড়ে ৩৮টি, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা সংলগ্ন পাহাড়ে ৩টি, জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটি সংলগ্ন পাহাড়ে ৩৩টি, মতিঝর্ণা ও বাটালি হিল পাহাড়ে ৩২০টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। এ ১১টি পাহাড় ছাড়াও আরো ১৪টি পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রয়েছে।

উচ্ছেদকারীদের স্থানীভাবে কোথাও পুনর্বাসন না করায় তারা পুনরায় পাহাড়ে অবৈধভাবে দখল করে বসতি তৈরী করে।