স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হলেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে অসমান্য অবদানের জন্য ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২১’ এ ভূষিত হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রয়াত প্রেসিডিয়াম সদস্য আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। তিনিসহ মোট ৯ ব্যক্তি ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদকের জন্য মনোনীত হয়েছেন।

আজ রোববার (৭ মার্চ) সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মনোনীতদের নাম প্রকাশ করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু আমৃত্যু চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন। আখতারুজ্জামান বাবুর পুত্র সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এমপি বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রি সভার ভূমি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগের মেয়াদে তিনি একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। বাবুর মুত্যুর পর শূণ্য আসনে বিজয়ী হয়ে টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসন থেকে।

আখতারুজ্জামান বাবুর আরেক পুত্র আনিসুজ্জামান চৌধুরী রণি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ইসি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জানা যায়, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ১৯৪৫ সালের ৩ মে আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম নুরুজ্জামান চৌধুরী ও মায়ের নাম খোরশেদা বেগম। ১৯৫৮ সালে তিনি পটিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ওই বছর ঢাকার নটর ডেম কলেজে ভর্তি হন।

উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনার সময়ে শিক্ষা বৃত্তি নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইলিয়ন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে যান। পরে তিনি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসা প্রশাসনে পড়াশোনা করেন। সেখান থেকে অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রি নিয়ে ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ আসেন। এরপর ১৯৬৫ সালে বড় ভাইয়ের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করেন।

তিনি ১৯৬৭ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে আনোয়ারা ও পশ্চিম পটিয়া থেকে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর তিনি দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন।

পঁচাত্তর সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হলে তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দল পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখায় কারাভোগসহ নির্যাতনের শিকার হন তিনি। তিনি চট্টগ্রাম থেকে ১৯৭০, ১৯৮৬, ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় তার পাথরঘাটা জুপিটার হাউস থেকে সংগ্রাম কমিটির কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রামে আসার পর ওই হাউস থেকেই সাইক্লোস্টাইল করে প্রচার করা হয়। তার বাসা থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রসহ সব জায়গায় পাঠানো হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি মুজিবনগর সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি বিশ্বজনমত গড়তে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে যান। তিনি প্রথমে লন্ডনে যান। সেখান থেকে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে আমেরিকায় যান। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হিসেবে তিনি ১৯৭২ সালে গঠিত বাংলাদেশ গণপরিষদের সদস্য হন এবং বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ণে ভূমিকা রাখেন।

তিনি ছিলেন একজন শিল্পোদ্যোক্তা। তিনি ১৯৬৫ সালে ব্যবসা শুরু করেন। স্বাধীনতার পূর্বে চট্টগ্রাম নগরীর বাটালি রোডে রয়েল ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠা করেন। পরে আসিফ স্টিল মিল, জাভেদ স্টিল মিল, আসিফ সিনথেটিক, প্যান আম বনস্পতি, আফরোজা অয়েল মিল, বেঙ্গল সিনথেটিক প্রোডাক্টসহ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এছাড়া জামান শিল্প গোষ্ঠী ও বিদেশি মালিকানাধীন আরামিট মিল ক্রয় করেন এবং পরবর্তীকালে আরামিট গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন।

এর পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বেসরকারী ব্যাংক ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি দুই দফা চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি এ ব্যবসায়ী নেতা দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সভাপতি ছিলেন। তিনি ওআইসিভুক্ত দেশের চেম্বার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৯ সালে তিনি ৭৭ জাতি গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে তিনি প্রায় এক মাস ধরে চিকিৎসাধীন থাকার পর আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ২০১২ সালে ৪ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।

এছাড়া একই ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পাচ্ছেন মরহুম একেএম বজলুর রহমান, শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার, মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল খুরশিদ আহমেদ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ড. মৃণ্ময় গুহ নিয়োগী, সাহিত্যে কবি মহাদেব সাহা, সংস্কৃতিতে আতাউর রহমান ও গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সমাজসেবা ও জনসেবায় ড. এম আমজাদ হোসেন, গবেষণা ও প্রশিক্ষণে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল পুরস্কার পাচ্ছেন।